গাছ পাথরের স্বপ্ন দেখা এবং অতঃপর....

শামস মোহাম্মদঃ অনেক দিন ধরে মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, পরমত সহিষ্ঞুতা, জাতীয় অগ্রগতির সুস্থ রাজনীতি কি আর কেনোদিনই দেখতে পাবে না দেশবাসী- কেবল কি হানাহানি সম্বল? দেশ স্বাধীন হবার ৪০ বছরে ২/৩টি প্রজন্ম বেরিয়ে গেছে। বৃহত্তম জনগোষ্ঠির কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনা ও ইতিহাস ফিকে হয়ে আসছে ক্রমশঃ। কিন্তু, একটা প্রশ্নে নাগরিকরা একমত- সবাই চায় দেশ এগিয়ে যাক, সামনের দিকে। কিন্তু কি করে হবে তা?

আমার মত কিছু বোকারা স্বপ্ন দেখেছিলো- এক এগারর ঝড়ের পরে ‌এবার হয়তো রাজনীতিতে সহনশীলতার সুবাতাস বইবে। কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্যে বোধ 'সুখ' আর নাই। জন্মই যার আজন্ম পাপ! এ দেশটা জন্ম হয়েছে একটা 'প্রিমেচিউর বেবি' হিসাবে। অপারেশনটি হয়েছে- মা ও বাচ্চার স্বার্থে নয়, বরং ডাক্তারের স্বার্থে। তখন থেকেই এই পঙ্গু শিশু রাষ্ট্রটি ধুকে ধুকে চলছে। যখনই দাড়িয়ে দু'কদম হাটে, তখনই থামিয়ে দেয়া হয়। সেই জন্মকালের দায়ভারের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। কথামত না চলায় অনেক দুর্ঘটনা ঘটোনো হয়েছে এ দেশে-পচাত্তর, একাশি, বিরাশি, ছিয়ানব্বই, দু'হাজার ছয়-সাত-আট-নয়-দশে। তেরই নভেম্বর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে বিরোধী দলীয় নেত্রীর  সাথে যে অসভ্যতা করা হলো, তার অনেক রকম বিচার বিশ্লেষন চলছে এখন। শাসক শিবিরে আত্মতুষ্টির ঢেকুর দেখা গেলেও সর্বসাধারন প্রায় একমত- এরকম না করলেও চলতো। এর ভবিষ্যত ভালো হবে না।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করে আর যাই হোক নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবী করা যায় না। মইনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে 'এভিকশন' করার জন্য কোর্টের কোনো আদেশ ছিলো না, বরং সর্বোচ্চ আদালতে পেন্ডিং ছিলো পুরো বিষয়টি। এ অবস্থায় টেলিফোন, পানি, বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে কুড়াল-শাবল দিয়ে দরজা-গেট ভেঙ্গে, অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে যে নির্মমভাবে ৩৮ বছরের বসতবাড়ি থেকে ভিটা ছাড়া করা হয়েছে, সামরিক প্রচার মাধ্যমকে মিথ্যাচারে ব্যবহার করা হয়েছে- তা নজিরবিহীন। ঘটনার নির্মমতায় জনমনে সঞ্চারিত ধিক্কারের চোটে দিশাহারা হয়ে সরকার এখন ভাঙ্গা দরজায় নতুন রং-বার্নিশ করে ছবি তুলে প্রচার করছেন, যা কেবলি নিজেদের দেউলিয়াপনার চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ''রান্না ঘরে কে রে- আমি কলা খাই না'' র মত অবস্থা। শাক দিয়ে কি আর মাছ ঢাকা যায়? ওই অপকর্মের আর রিপেয়ার সম্ভব হবে না। জনগনের কাছে সরকারের নৈতিক পরাজয় ঘটে গেছে। ইতোমধ্যে খবর রটেছে, 'সুধাসদন' থেকে প্রতীকি হিসাবে একখন্ড ইট খুলে নিয়ে গেছে প্রতিবাদিরা। তবে এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে আরো কত কি ঘটবে, সেটা ভেবেই শিউরে উঠি। আবার কার বাড়িতে শাবলের আচড় পড়ে বা ভিটায় ঘু ঘু চড়ে; তখনও আইএসপিআরের মত প্রতিষ্ঠান একই রকমের প্রেস রিলিজ দেবে, কোনো সন্দেহ নাই।

সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা একটি প্রতিষ্ঠান। উচ্ছেদের সময় উনার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে কিনা সরকার সেটা তদন্ত করে অন্তত কিছুটা ভদ্রতা দেখাতে পারতো! আইএসপিআর পরিচালকের ন্যায় একজন মধ্যমমানের কর্মকর্তা দিয়ে তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে কন্ট্রাডিক্ট করিয়ে যে অভদ্রতার নজির সৃষ্টি করলেন, তাতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা সরকারের ইমেজ বাড়লো না কমলো, সেটা ভাববার বিষয়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ভবিষ্যতে একইরূপ আচরন প্রাপ্তির ক্ষেত্র তৈরী করলেন শেখ হাসিনা। ২০০৭ সালে জেনারেল মইনের নির্দেশে শেখ হাসিনাকে আটক করে কোর্টে তোলার সময় টেনে হিচঁড়ে যে অসভ্যব্যবহার করেছিলো, ওই ঘটনার একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন তার চির প্রতিদ্বন্দ্বি- খালেদা ‍জিয়া। এক্ষণে সেউদারতার উত্তম প্রতিদান/জবাব দিলেন শেখ হাসিনা! কথায় কথা আসে। স্মর্তব্য, ১৯৮১ সালের কথা। ১৭ মে শেখ হাসিনাকে ভারতে থেকে দেশে আসার অনুমতি দিয়ে (আওয়ামীলীগকে পুনরুজ্জীবন করে) দলের সভাপতি হতে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার ঠিক ২ সপ্তাহের মাথায় জেনারেল জিয়া নিহত হলেন চট্টগ্রামে। শেখ হাসিনার দীর্ঘকালের সহকারী মতিউর রহমান রেন্টু 'আমার ফাঁসি চাই' গ্রন্থের ৮২-৮৭ পাতায় লিখেছেন, ''৮১ সালের ২৩ শে এবং ২৪শে মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির তিন তলার সেমিনার কক্ষে '৭১ ও '৭৫-এর যোদ্ধাদের এবংসেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের গোপন ও জরুরী বৈঠক বসে। এই বৈঠকে কর্নেল শওকত আলী (যিনি এখন ডেপুটি স্পীকার) মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে হত্যার পরিকল্পনা এবং হত্যাকালীন ও হত্যা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে অবহিত করেন। কর্নেল শওকত আলী বলেন, জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে গেলে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর বীর উত্তম-এর নেতৃত্বে জিয়াকে হত্যা করা হবে এবং এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সভানেত্রী শেখ হাসিনা অবহিত আছেন। সভানেত্রী আমাদেরকে এই হত্যাকান্ডে সহায়তা ও ভূমিকা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।'' জিয়া হত্যাকান্ডের পরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারের সরকার ৮১ সালের ৮ জুলাই ''জাতির প্রতি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অসামান্য অবদানের কথা বিবেচনা করে'' জিয়া পরিবারের বাসস্থানের জন্য খালেদা জিয়ার নামে ৯৯ বছরের জন্য লীজ দেন- মইনুল রোডের আলোচ্চ বাড়িটি। সেই থেকে উচ্ছেদ অবধি খালেদা জিয়া ঐ বাড়িতে পরিবার সমেত বসবাস করে আসছেন। দুর্মুখেরা বলছেন, একাশি সালে যে কাজটুকু বাকী ছিলো এবারে তা সম্পন্ন করা হলো!

২০০৭ সাল ছিলো জাতীয় জীবনের একটা বড় 'সেট ব্যাক'। ব্যক্তি, সমাজ, ও রাষ্ট্রজীবনে যে অপঘাত এসেছিলো,তা এক জীবনে ভুলবার নয়। বিশেষ করে ভুক্তভোগীদের কথা তো আলাদা। স্বাধীনতা পূর্বকালে পরাধীন দেশেও রাজনীতি-রাজনীতিকদের ওপরে সামরিক খগড় নেমেছিলো। কিন্তু তা শালীনতার মাত্রা ছাড়ায় নি। রাজবন্দি বিষয়টা ছিলো একটা গর্বের মত। কিন্তু ২০০৭ সালের জরুরী শাসনের সময়ে রাজনীতিবিদদেরকে চোর-ছ্যাচড়দের কাতারে নামিয়ে মিথ্যা মামলা, রিমান্ড, অন্ধপ্রকোষ্ঠে নির্যাতন, ফরমায়েশী স্বীকারোক্তি আদায়, কাঙ্গারু কোর্টে বিচারের নামে প্রহসন, এমনকি উলঙ্গ করেও নির্যাতন করা হয়েছে। এসব ঘটনার স্মৃতি এখনো জ্বাজ্যল্যমান।

উনত্রিশে ডিসেম্বরের নির্বাচনে যতটা না ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা ছিলো, তার চে' বেশী ছিলো অত্যাচার থেকে মুক্তির স্বপ্ন। বিএনপি দাবী করেছে, কেবল জরুরী অবস্থার অবসানের জন্যই নির্ব‍াচনে গিয়েছিলো, যদিও নির্ব‍াচনে প্রক্রিয়াগত অনাচার দৃশ্যমান ছিলো। অস্বাভাবিক স্ফীত বিজয়ীরা ক্ষমতাসীন হয়েই প্রথমেই ভুলে গেলো তার নিকট স্মৃতি। চৈতণ্যে আসলো, আগেরবারের শৈথিল্যগুলোর কথা। সেবার যা যা করা সম্ভব হয়নি, যে করেই হোক প্রথমে হবে তার বাস্তবায়ন। আর তাই নব উদ্যমে সংহারী রূপে আবির্ভাব। নৈতিকতা, জাতীয় মানদন্ড, সুস্থ রাজনীতি,পরমত সহিষ্ঞুতা, জাতীয় অগ্রগতি- সব চুলোয় যাক, কেবলই নির্ধারিত এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ওইসব ভালো ভালো শব্দ বইপুস্তক-অভিধানেই থাক!

জাতি হজম করছে কামরুল-হানিফ বল্গাহীন ধারাবাহিক খিস্তি খেউড়। 'দশ টাকার চাল-বিনা মূ্ল্যের সার দেয়ার' মত জনগুরুত্বপূর্ন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার বেরিয়ে গেলো। নানাবিধ উটকো এজেন্ডা মুখ্য হয়ে গেলো। নাগরিকরা বুঝতে পারছে না- এ কোন সরকার! একে একে ছয়-সাত হাজার মামলা তুলে ফেললো শুধু নিজ দলীয় লোকদের- এমনকি খুন ধর্ষনের মামলাও থাকল না, বিরোধী দলকে ঘরে-বাইরে পিটিয়ে লম্বা করা হলো- গুম করে ও প্রকাশ্য রাজপথে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, অনির্ধারিত পদ্ধতিতে সংবিধানকে কাটা ছেড়ার মহড়া, সংসদকে এক দলীয়করন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নমত দলনের জন্য যুদ্ধাপরাধকে ব্যবহার করে, পুলিশ-প্রশাসন চুড়ান্ত দলীয়করন সম্পন্ন করে, বিচার বিভাগকে সামরিক কায়দায় বশ করে ইচ্ছেমত সকল প্রয়োজনে অপব্যবহার, রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য ডজন ডজন মিথ্যা মামলা দিয়ে আসামী-পুলিশ-আদালতের ওষ্ঠাগত প্রাণ। সবশেষে, বিরোধী দলীয় নেতাকে বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে উচ্ছেদের তান্ডবে বর্তমান সরকার ও সিষ্টেমের ভবিষ্যত নিয়ে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রেসিডিয়াম মেম্বারও অনবরত আশংকা ব্যক্তকরে চলছেন- সংশোধন না হলে পচাত্তর বা ওয়ান ইলেভেন থেকে ভয়াভয় ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা। কিন্তু কে শোনে কার কথা? দেখে শুনে মনে হচ্ছে- ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত বোধ হয় কারো আর হুশ হবে না! সুবচন আজ নির্বাসনে! আখেরে, দেশে মহাবিপর্যয় নামলে জনগন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, তার সাথে জাতীয় অগ্রগতি হবে উল্টেগামী। 

মইনুল রোডের উচ্ছেদ তান্ডবের পর অনেকেই জানতে চাইছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যতে সময় খারাপ হলে,তিনি কি রকম ব্যবহার প্রত্যাশা করেন- আজকের বিরোধী দলীয় নেত্রীর কাছ থেকে। প্যারোলে থেকে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়ে আদালতকে পাশ কাটিয়ে সরকারের নির্বাহী আদেশে প্রত্যাহার করলেন একে একে ১৫টি মামলা; কি রকম স্বস্তিতে আছেন তিনি? ফাঁড়া কিন্তু কাটেনি! সময় বহিয়া যায়। 

ইতি। গাছপাথর।