‘তারেক রহমানের কোনো ইমেজ সঙ্কট নেই’ -শওকত মাহমুদ


 

শওকত মাহমুদ। পেশায় তিনি সাংবাদিক। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি। সর্বশেষ বিএনপি কাউন্সিলে সম্মানিত হয়েছেন বিএনপির উপদেষ্টা হিসেবে। সমসাময়িক রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে বলেন রাজনীতির উত্তরাধিকার নিয়ে। ইতিবাচক রাজনীতির সম্ভাবনা দেখছেন জয়-তারেকের নেতৃত্বে। ব্যাখ্যা করেছেন তারেক রহমানের ইমেজ সংকটের বিষয়টি। অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ রাখেন সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি। আশংকা প্রকাশ করেন দুই নেত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে। সংবাদের নামে প্রপাগান্ডা চালানোর অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেছেন গণমাধ্যমের ভূমিকাকে। ১/১১, বিডিআর পুনর্গঠন, পাহাড়ে সহিংসতা, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যক্ত করেন তার প্রাজ্ঞ মত। সরকারের এক বছরের কাজের সমালোচনা করে ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মহিউদ্দিন নিলয় ও আনিস রায়হান

সাপ্তাহিক : রংপুর থেকে প্রাথমিক সদস্যপদ লাভের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে জয়ের আগমনের প্রক্রিয়াকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
শওকত মাহমুদ : প্রথমত আমি জয়ের রাজনীতিতে আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছি। অনেকদিন ধরেই কথাটা শোনা যাচ্ছিল। হয়ত জয়ের অনিচ্ছাই ছিল। তাই তিনি এতদিন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। বলা যায়, তিনি একটু দেরি করেই রাজনীতির মঞ্চে পা রাখলেন। এর আগে আমরা তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও দেখেছি, তিনিও বগুড়ার গাবতলী থেকে প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়েছিলেন। তবে এখানে পার্থক্যটা হচ্ছে, তাকে সদস্যপদ দেয়া হয়েছে, হয়ত তার সম্মতিক্রমেই কিন্তু এখনো তা মুখ ফুটে বলেননি। তিনি রাজনীতিতে এসেছেন এবং তার পরিকল্পনা কি তাও জানা যায়নি। আমরা অনুমান করতে পারি যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সরকারের যে শ্লোগান, জয় হয়ত সেখানটাতেই আগ্রহবোধ করছেন এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে তার হয়ত পরিকল্পনাও আছে। তার এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি।
সাপ্তাহিক : দুই নেত্রীর মতো তারেক ও জয়কে ঘিরে তুলনামূলক অনেক আলোচনা শোনা যাচ্ছে। দুই নেত্রীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের যে বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক তা কি তারেক-জয়ের মধ্যেও সমান তালে চলতে থাকবে?
শওকত : আমার মনে হয় না এমনটা ঘটবে। যে ধরনের ‘অসম্পর্ক’ দুই নেত্রীর মাঝে বিরাজমান তা জয়-তারেকের মাঝে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম বলেই আমার ধারণা। আমার মনে আছে, জয়কে একবার তারেক ফুল দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন। জয় তখন ফুল নিয়েছিলেন কি না, কিংবা তার প্রতিক্রিয়া কি ছিল তা আমি জানতে পারিনি। তবে তারা যেহেতু নতুন প্রজন্ম। নতুন সময়ের মানুষ। তাদের কর্মকাণ্ড, চিন্তা-ভাবনা পূর্ববর্তীদের চেয়ে কিছুটা হলেও পৃথক হবার কথা। রাজনৈতিক মৌলিক দর্শনের ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন মঞ্চে থাকলেও রাজনৈতিক তৎপরতা, কার্যক্রম, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জাতির যে প্রত্যাশা, সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনীতিকদের সুসম্পর্ক এসব ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তনের একটা সম্ভাবনা আছে। তারেক রহমানের বাবা প্রেসিডেন্ট ছিলেন, স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন। তার মা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি নিজে সরকারে ছিলেন না। তবে সরকারি দলে ছিলেন। এত কিছুর পরও একটা জিনিস কখনো অফিসিয়ালি প্রমাণ করা যাবে না যে, এসব পরিচয় ব্যবহার করে তিনি সরকারকে কোনো সুবিধা গ্রহণ করেছেন। বরং তিনি তৃণমূল থেকে আস্তে আস্তে তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। এখানে জয়ের ক্ষেত্রে একটা ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যখন ওয়াশিংটন গিয়েছেন তখন জয় নিজেকে তার উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। অথচ আমরা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের নাম তালিকায় কখনো তার নাম দেখিনি। এ বিশেষ সুবিধাটা তিনি নিয়েছেন, এটা আমি বলব না। হয়ত তার উপস্থিতি রাষ্ট্রের কোনো প্রয়োজনেই হয়েছে। তারপরও এটুকু বলা যায় যে, রাজনীতির দীক্ষার চেয়ে সরকারের দীক্ষাটাই জয়ের আগে হয়েছে। তবে তারেক রহমান সরকার থেকে নয়, তৃণমূলের রাজনীতি থেকেই উঠে এসেছেন। জয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের আশাবাদ হচ্ছে তিনি তৃণমূলের রাজনীতিতে থাকবেন। তারেক রহমান যেমন অনেক গবেষণা জরিপ চালিয়ে দেশের কৃষি এবং অন্যান্য খাত সম্পর্কে নিজের ভিশন ঠিক করেছিলেন, জয়ও তেমনি দেশ ও দেশের মানুষকে বুঝবেন এবং দেশের উন্নতির জন্য নিজস্ব একটি পরিকল্পনাসহ মাঠে নামবেন।
সম্প্রতি কিছু কাগজে আমার নামে একটি ভুল সংবাদ ছাপা হয়েছে। কাগজগুলো লিখেছে, আমি নাকি বলেছি যে, ‘জয়কে রাজনীতি শিখতে হবে তারেকের কাছ থেকে।’ কথাটা আসলে ঠিক নয়। বরং জনকণ্ঠে সঠিক সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে। আমি বলেছিলাম যে, তারেক রহমানকে অনুসরণ করে একজন রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। এ অনুসরণের মানদণ্ড হচ্ছে, দুজনেই নিজ নিজ এলাকা থেকে সদস্যপদ গ্রহণ করে রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন। তবে এ ধরনের রাজনীতির অনুসারী হতে হলে জয়কে কিছু জিনিস আয়ত্ত করতে হবে, কিছু সমস্যা সমাধান করেই সামনের দিকে পা ফেলতে হবে। যেমন, জয় মার্কিন নাগরিক। আমাদের দেশের বর্তমান নির্বাচনী আইনে দ্বৈত নাগরিকত্ব একটা বড় ধরনের সমস্যা। এহসানুল হক মিলনকে আমরা মার্কিন নাগিরকত্ব ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নিতে দেখেছি। জয়কেও বাংলাদেশে রাজনীতি ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বড় একটা সমস্যা পোহাতে হবে। আবার, আরেকটা বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আসলে ব্যক্তিগত বলে কিছু থাকে না। তারা জনগণের হয়ে যায়। সারা পৃথিবীতেই দেখা গেছে, নেতাদের জীবনযাপনের রীতি নিয়ে জনগণ মত প্রকাশ করেছে। যেসব নেতৃবৃন্দ জনগণের মতামত গ্রহণ করে নিজেদের শুধরেছেন, তারা টিকে ছিলেন, অন্যদের জনগণই হটিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, একজন নেতার ব্যক্তিগত জীবনও আসলে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। জয় যেহেতু বিদেশিনী বিয়ে করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারটাও তাকে দেখতে হবে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেক বিষয় আছে। জেনারেল মইনের হাতে যখন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা নির্যাতিত হচ্ছেন, তখন জেনারেল মইন বোস্টনে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ওপর অনুষ্ঠিত একটি সেমিনার গিয়েছিলেন। সেই সেমিনারে জয় বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং মইনের সঙ্গে মিটিংও করেছিলেন। মইনের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তার এই শলাপরামর্শ করাটা ছিল বড় ভুল। এখানে তিনি রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। সমস্যাগুলো তাকে সমাধান করেই সামনের দিকে এগুতে হবে।
সাপ্তাহিক : তারেক রহমান সরকারি দলে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে, জয়কে নিয়েও সম্প্রতি তৌফিক-ই-এলাহীকে জড়িয়ে একটি অভিযোগ উঠেছিল...
শওকত : ১/১১-এর পর তারেক রহমানকে অভিযুক্ত করে মিডিয়ার একটা অংশ ঘৃণ্য অপপ্রচার শুরু করেছিল। তার ফলশ্রুতিতে জনমনে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা হলেও এখনো কোনো মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। মামলাগুলোতে সরাসরি তিনি আসামি নন। আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তাকে আসামি করা হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের সামনে এখন এই ষড়যন্ত্র পরিষ্কার হয়ে গেছে। জয়কে ঘিরেও এ ধরনের কথা উঠছে। শেভরনের সঙ্গে দুর্নীতিতে জড়ানো নিয়ে তাকে বিব্রতকর একটা অবস্থাতেই ফেলা হয়েছে। তৌফিক-ই-এলাহী এ ঘটনার জবাব দিয়েছেন এবং আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু জয়ের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জয় কিছু বলুক বা না বলুক অভিযোগ উঠলে তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
সাপ্তাহিক : জয়ের রাজনীতিতে আসা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবারতন্ত্রের যে ধারাবাহিকতা, তাকে আরো দীর্ঘায়িত করবে কি?
শওকত : পরিবারতন্ত্রটা শুধু আমাদের দেশে নয়। এটা সারা বিশ্বেই আছে। এটাকে আমি পরিবারতন্ত্র নয় ‘রাজনৈতিক উত্তরাধিকার’ বলি। রাজনৈতিক পরিবারের কেউ যদি রাজনীতি করার যোগ্যতা, সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে তাকে তো পরিবারতন্ত্রের কথা বলে আমরা দূরে ঠেলে দিতে পারি না। পাকিস্তান ভারত, শ্রীলঙ্কা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই আমরা এ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দেখেছি। পৃথিবীর দেশে দেশে জনগণ এ উত্তরাধিকার মেনে নিয়েছে। তাও দেখেছি। একে পরিবারতন্ত্র বলা যায় না। কারণ এখানে পরিবারের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য কিছু করা হয় না। আরেকটা জিনিস পরিবারতন্ত্রের কথা বলে সবাই খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনার দিকে আঙ্গুল তোলে। কিন্তু আমরা তো দেখেছি উদারপন্থীরাও তাদের পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে টেনে এনেছেন। গ্রাম মফস্বল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সর্বত্রই এই জিনিসটা ঘটছে। আসলে পরিবারতন্ত্রটা হচ্ছে পরিবারকে ব্যবহার করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেয়ার প্রবণতা। এটা জয় বা তারেকের নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। তারা এমনিতেই যথেষ্ট যোগ্য।
সাপ্তাহিক : তারেক ও জয় আগামী দিনে কেমন প্রতিপক্ষ হবে বলে আপনি মনে করেন?
শওকত : দুটি হচ্ছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব। এখানে ব্যক্তিটা আসলে মুখ্য নয়। মুখ্য হচ্ছে রাজনৈতিক দর্শন। তার পরও ব্যক্তির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংগঠনের অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। দুই নেত্রীর স্থলাভিষিক্ত তারা যদি হতে পারেন, তাহলে আমার মনে হয় মৌলিক কিছু পরিবর্তন আসবে। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলতে গেলে বলতে হচ্ছে যে, জয়কে ভালোভাবে বাংলাদেশকে বুঝতে হবে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ সংক্রান্ত তার যে ধারণা তা আসলে সঠিক নয়। কারণ, বাংলাদেশে জঙ্গি আর আল কায়েদা দুটো সম্পূর্ণ পৃথক জিনিস। আমাদের দেশে যে সমস্যা আমরা তা নিজেরাই সমাধান করতে পারছি। একে আল কায়েদার সঙ্গে জড়িয়ে বিশ্বের দরবারে নিজেদের খাটো করা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে বিদেশি বাহিনীকে দেশে নিমন্ত্রণ জানানোটা আসলে কাজের কিছু নয়। এ সমস্ত বিষয় জয়কে পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করতে হবে।
সাপ্তাহিক : তারেক রহমানের নামে যে সমস্ত অভিযোগ উঠেছে, তার ফলে তিনি যে ইমেজ সঙ্কটে পড়েছেন, তা কাটিয়ে উঠতে তাকে কোনো বেগ পেতে হবে কি?
শওকত : তার কোনো ইমেজ সঙ্কট এখন আর নেই। কৃত্রিম যে সঙ্কটটি তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল তা তিনি অনেক আগেই কাটিয়ে উঠেছেন। তার বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। জনগণের কাছে সব ষড়যন্ত্রই পরিষ্কার হয়ে গেছে।
সাপ্তাহিক : বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন?
শওকত : বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিরোধী দল হিসেবে একটা রেকর্ড গড়েছে। তারা বিগত ১৪ মাসে কোনো হরতাল ডাকেনি। ২০০১ সালের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ৮ম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে পল্টন ময়দানে সমাবেশ ডেকে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী এই সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বলেছিলেন, সরকারের যে নির্বাচনী অঙ্গীকার আছে সেগুলো বাস্তবায়নে তিনি সহযোগিতা করবেন। তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেও আমরা দেখেছি, সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। বরং আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আওয়ামী লীগ তার বিপুল বিজয় দেখে বিএনপিকে অসহায় এবং সমর্থহীন মনে করল। তারা ভাবল, বিএনপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই তারা একতরফাভাবে বিএনপি বিরোধী অবস্থানে চলে গেল। আমার মনে হয় এটা সরকারের খুব বড় একটা ভুল এবং এটা তাদের জন্য বুমেরাং হবে। তাদের উচিত ছিল বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ১/১১-র ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করা এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা। কিন্তু সরকার পক্ষ তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে সবচেয়ে যৌক্তিক, সুচিন্তিত এবং যথোপযুক্ত ভূমিকা রেখেছে। ১৪ মাসে বিএনপি তার কর্ম দিয়েই প্রমাণ করেছে তারা কতটা সহিষ্ণু। আগে বলা হতো যে, হরতাল অবরোধের জন্য দেশে বিনিয়োগ আসে না, ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো চলে না। কিন্তু এবার কী হয়েছে? এখন বিনিয়োগ বাড়ছে না কেন? এখন তো আর বিরোধী দলকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
সাপ্তাহিক : অনেকে অভিযোগ করছেন, বিএনপি তার নিজস্ব অন্তর্কোন্দল, নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় সব মিলিয়ে এখনো আন্দোলনে যাবার মতো শক্তি অর্জন করতে পারেনি...
শওকত : বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে শামিয়ানা টানাবো পরে বিরিয়ানি খাব এমনটা কখনো হয়নি। আপনি ইতিহাসের দিকে তাকান, বিএনপি-আওয়ামী লীগ প্রত্যেকেরই এ রকম অনেক ঘটনা আছে। তারা বড় বড় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের আগে কেউ ভাবেনি এটা তাদের দিয়ে সম্ভব। কোনো দল যদি অগোছালো থাকেও সেটা জনগণের ধাক্কাতেই ঠিক হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা কোনো বিষয়ই না। সংসদের কথা বলতে গেলে বলতে হয় যে, সংসদ বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু নয়। ৯১ থেকেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের সংসদ আসলে একদলীয় সংসদ।  সে ক্ষেত্রে আমি বলব যে, বিএনপি যথেষ্ট গোছালো আছে এবং যে কোনো সময় যে কোনো মাত্রার কর্মসূচি নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব।
সাপ্তাহিক : কিছুদিন আগে বিরোধীদলীয় নেত্রীর কার্যালয়ের সামনে বোমা হামলার ঘটনায় বিএনপির মহাসচিবের পুত্র পবনকে জড়িয়ে যে অভিযোগ উঠেছে...
শওকত : আসলে এটা সুস্থ মানুষের কাছে বলার কোনো কথা নয়। যিনি এই মামলার তদন্ত করছেন তিনি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। বিএনপি একটি সুশীল বিরোধী দল হওয়ায় এটা নিয়ে কোনো হৈ চৈ করেনি। আমার মনে হয় সরকার এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করেনি। একদিনের মধ্যেই মামলার জনৈক তদন্ত কর্মকর্তা বের করে ফেললেন হামলাটা কে করেছে। পবনকে পেয়ে সরকার খুবই খুশি। যদিও অনেকের কাছেই তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। সরকারের উচিত ছিল বিরোধীদলীয় নেত্রীর নিরাপত্তার অবস্থা যে খুবই নাজুক, তা স্বীকার করে নিয়ে দ্রুত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তা তো সরকার করেই নি বরং পবনের গল্প ফেঁদে উল্টো হেঁটেছে। এটা দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার অভিমত। বিশেষ কোনো দলের লোক হিসেবে নয়। পবন সম্পর্কে আজকে যে স্বীকারোক্তি এসেছে, স্বীকারোক্তিদাতা কাল আদালতে বলতে পারে যে, এটা তাকে দিয়ে জোর করে করানো হয়েছে। এ রকম স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের ঘটনা তো হরহামেশাই ঘটছে। সুতরাং কেউ একজন বললেই আরেকজনকে নিশ্চিতভাবে অপরাধী বলা যায় না।
সাপ্তাহিক : সরকারের ১৪ মাস ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। ভিশন-২০২১-এর লক্ষ্যে সরকার কতটা এগুতে পেরেছে বলে আপনি মনে করেন?
শওকত : সরকার ভিশন-২০২১-এর লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে- এটা জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। বিরোধীদলীয় নেত্রীর দিকে তাকান, তিনি বাসার মধ্যে গৃহবন্দি থাকেন। তার কাছে কেউ যেতে পারে না, কোনো বার্তা পৌঁছায় না। প্রধানমন্ত্রীও স্বেচ্ছাবন্দিত্ব বরণ করেছেন। তিনি নিজেই বলেন, বুলেট তাকে তাড়া করে ফিরছে। অবস্থাটা এমন যে, একজন অন্যজনের ইচ্ছার গৃহবন্দি। অন্যজন স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। এই অবস্থায় ভিশন-২০২১ বা ডিজিটাল বাংলাদেশ, কোনো লক্ষ্যেই পৌঁছানো সম্ভব না। আবার, গত এক বছরে সরকার যেভাবে দলীয়করণ করেছে, নাম বদলের কাজে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে, উন্নয়নের প্রশ্নে অমনোযোগিতা প্রদর্শন করেছে, তাতে করে দেশ এগুনোর বদলে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। যেমন- বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশ বেড়েছে। তাই জিনিসপত্রের দামও অনেক বেড়ে গেছে। বলা হচ্ছে যে, এ বছর যদি ফসল উৎপাদন ঠিকমতো না হয় তাহলে দেশে বড় ধরনের একটা খাদ্য সঙ্কট দেখা দেবে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সরকার সাধারণ ব্যবস্থাপনাই ঠিকমতো করতে পারছে না, লেজে গোবর হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ২০২১ সালের রূপকল্পে পৌঁছানোর তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া ২০২১ সালের রূপকল্পে পৌঁছানোর জন্য যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন ছিল সরকার নিজে সে সম্ভাবনা ধ্বংস করেছে। শুধু প্রকল্প ঠিক করে টাকা খরচ করলেই দেশ এগোয় না। দেশ এগুতে হলে রাজনৈতিক স্থিরতা দরকার। গত ১৪ মাসে সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, সরকার দেশের জনগণের মধ্যে একের পর এক অস্থিরতা জন্ম দিয়েছে। এই করব, সেই করব, অমুককে ধরব, সরকার বারংবার এসব বলেছে। কিন্তু মানুষের জীবন ধারণের যে চেষ্টা, তাতে সহযোগিতার কোনো চেষ্টা সরকার করেনি।
সাপ্তাহিক : আপনি বলছেন, সরকার দেশজুড়ে অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদেরকে বিপাকে ফেলার জন্য, উন্নয়ন ব্যহত করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে একটি পক্ষ অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে...
শওকত : কী ষড়যন্ত্র? কোথায় ষড়যন্ত্র? বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাকে বলা হচ্ছে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র? আমরা তো দেখলাম, হত্যাকারীদের সঙ্গে তারা সকালে মিটিংয়ে বসছে। সরকার উৎখাতের জন্যই যদি তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাহলে প্রধানমন্ত্রী কীভাবে তাদের সঙ্গে মিটিং করে। এ ধরনের মিটিং তো তিনি করতে পারেন না। দেশের এত বড় সঙ্কটের মুহূর্তে অবশ্যই সর্বদলীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল, সবগুলো প্রতিনিধিত্বশীল দলকে ডেকে, আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করা। আর কি ষড়যন্ত্র হচ্ছে? জঙ্গি ধরা পড়ছে? বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস বলে যে, জঙ্গিরা কোনো সরকার পতন ঘটাতে পারে না। এ দেশের প্রত্যেকটা গণতান্ত্রিক সরকারই তাদের মেয়াদ পূর্ণ করেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। আসলে সরকার পতনের চেষ্টা কেউ করছে না। বরং সরকার নিজেই নিজের মেয়াদ পূর্ণ করার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়েছে। তাই তারা এসব কথা প্রচার করছে।
সাপ্তাহিক : বিডিআরের কথা বলছিলেন, বিডিআর পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রশ্ন এবং ওই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াকে কীভাবে দেখছেন?
শওকত : প্রথমেই বলতে হচ্ছে যে, ‘বিডিআর’ নামটি আকাশ থেকে পড়েনি। এই নামের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। নাম পরিবর্তন করলে কারো চরিত্র বা তার ভেতরের অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই বিডিআরের নাম পরিবর্তনটা খুবই অযৌক্তিক একটা কাজ। আমি এর প্রতিবাদ করছি। আর বিচার প্রক্রিয়াটাও চলছে খুব অস্বচ্ছ ধারায়। বিচারে সাংবাদিকদের থাকার অনুমতি দেয়া হলেই বিচার প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু বলা যাবে না। এখন যা ঘটছে তাতে আসলে আসামি পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকছে না। বাহ্যিকভাবে হয়ত সব আনুষ্ঠানিকতাই সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু ভেতরে একটা ফাঁকা রয়ে গেছে। কেন, কীভাবে ঘটনা ঘটল? মানুষের কাছে এখনো এসব পরিষ্কার না। বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও জনগণ চিন্তিত। ৭ বছর কিংবা ৪ বছর তো এই মামলার সাজা হতে পারে না। নিহত সেনা সদস্যদের পরিবারের সদস্যরাও এ বিষয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে আমরা শুনেছি। আর সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগের বিষয়টিকেও আমরা ইতিবাচক মনে করছি। তবে একতরফাভাবে অবসরপ্রাপ্তদের দিয়ে কাজ না শুরু করে বরং পুরনো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি কিছু নবীন কর্মকর্তাদেরও সঙ্গে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।
সাপ্তাহিক : পাহাড়ে সম্প্রতি সৃষ্ট সহিংসতার বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?
শওকত : পাহাড়ে দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যা আছে। ভূমি কমিশন, জমির মালিকানা এসবকে কেন্দ্র করেই পাহাড় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সরকারকে দ্রুতই এই প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ মিডিয়া একটি বাঙালি বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা বাঙালিদের সমস্যাগুলো ঢেকে রেখেছে। এমনভাবে প্রচার করছে যেন, সব দোষ বাঙালিদের। এটা একটা ভুল অবস্থান। মিডিয়ার কাজ সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা। প্রপাগা-া চালানো নয়।
সাপ্তাহিক : শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে...
শওকত : শান্তি চুক্তির মধ্যে কিছু অসাংবিধানিক দিক রয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাঙালিরা সেখানে জমি কিনতে পারবে না। এটা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী। এ রকম আরো কিছু ধারা আছে যেগুলো একেবারেই অবাস্তবায়নযোগ্য। হয়ত সরকার তখন পাহাড়িদের শান্ত করার জন্যই এসব করেছে। কিন্তু এখন যদি সরকার এই  চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে যায় তাহলে বাঙালিরা তাতে বাধা দিয়ে বসতে পারে। তাই সরকারের উচিত পাহাড়ি-বাঙালি প্রতিনিধিসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরামর্শ করে চুক্তিটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া। আর একটা জিনিস সকলকে মনে রাখতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড। বাংলাদেশের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনী অবশ্যই সেখানে থাকবে। আর্মি থাকলে পাহাড়িদের কি কি সমস্যা হয় তারা তা বলুক। সেসব সমস্যা সমাধান করা হবে। কিন্তু আর্মি কেন সরাতে হবে তা আমি বুঝি না। আর্মি চলে গেলে সেখানে বাংলাদেশের অন্য নাগরিকদের নিরাপত্তা কে দেবে? আমরা শুনেছি, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন পাহাড়ে সহিংসতার জন্য সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে সমালোচনা করেছেন। এটা খুব খারাপ একটা ইঙ্গিত। কারণ, আমরা জানি, ইতোপূর্বে জাতিসংঘেরই একটি চিঠির ওপর ভিত্তি করে ১/১১ এর জন্ম হয়েছিল। তাই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি মতামতের ব্যাপারে আমাদের সাবধান থাকতে হবে।
সাপ্তাহিক : যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াকে কীভাবে দেখছেন?
শওকত : আসলে আমরা অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। কিন্তু এর মধ্যে আমরা কোনো রাজনৈতিক বিদ্বেষ দেখতে চাই না। সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করে জনগণের সামনে সেই তদন্তপত্র প্রকাশ করুক। তারপর দেখুক জনগণ সেই তদন্তপত্র সমর্থন করছে কিনা। জনগণের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করেই সরকারকে যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা তৈরি করতে হবে। খবরের কাগজের কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে নয়। আন্তর্জাতিক বা দেশীয় কোনো ক্ষেত্রেই এটা গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই সরকারের উচিত রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে করণীয় ঠিক করা।