জিয়াউর রহমানঃ আমার সাক্ষ্য -সৈয়দ আলী আহসান

<

p>
একাত্তরের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন তুমুলভাবে চলছে এবং ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার প্রহসনলীলা তুঙ্গে উঠেছে, সে সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা নিষ্ত্র্নিয় ছিলাম না। আমি অনুভব করেছিলাম যে একটি দুর্যোগ আসছে। সুতরাং ছেলেমেয়েদের সকলকে আমি আমার সন্নিকটে আনতে চেয়েছিলাম। ঢাকায় আমার বড় মেয়ে মোহাম্মদপুরে তার নিজ বাড়িতে থাকত। এলাকাটি অবাঙালিদের। তাদের বাড়িতে ঢিল পড়তো রাতে। কখনও কখনও সরাসরি হুমকিও তাদের দেয়া হয়েছে। এ খবর পেয়ে আমি ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ আমার গাড়ি নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। পথে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে বিকেলের দিকে মোহাম্মদপুর এলাকায় আমার মেয়ের বাড়ির কাছে মোড় ঘুরতে গিয়ে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়লো। একটি কাক তড়িতাহত হয়ে মরে মাটিতে পড়ে আছে। আর এক তলা বাড়ির কার্নিশে এক সারি কাক বসে আছে। এক একটি কাক কা কা করে মৃত কাকটির শরীর প্রায় ছুঁয়ে উড়ে চলে গেল। কাকগুলো তাদের মৃতের প্রতি শেষ বেদনা নিবেদন করলো। দৃশ্যটি দেখেই আমার ছেলেকে গাড়ি থামাতে বলেছিলাম। আমি গাড়িতে বসে সম্পূর্ণ দৃশ্যটি দেখলাম। সে দৃশ্যের কুশীলবরা হচ্ছে কাক এবং রঙ্গ মঞ্চ হচ্ছে বাড়ির কার্নিশ এবং গাড়ি চলাচলের রাস্তা। আমি হঠাৎ কেন যেন শংকিত হলাম। শুনেছি ইতর প্রাণীরা পূর্বাহ্নেই অনুভব করে সংকট আসছে। আমার তখন মনে হল, হয়তো বিপদ শিগগিরই আসবে। সেদিন ছিল ২২ মার্চ। আমি চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি করে ঢাকায় এসেছিলাম আমার বড় মেয়ে, জামাই এং তাদের দুটি সন্তানকে নিয়ে যেতে।

মোহাম্মদপুরের বাসায় পৌছে মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম মনে আছে। মুনীর চৌধুরী রাতে দেখা করতে এসেছিলেন। পরদিন সকালে সবাইকে নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করলাম। এবারও কোন বিঘ্ন ঘটেনি। শুধুমাত্র ব্রিজের কাছে ডাইভারশনের কাছে এসে কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। আমাদের গাড়ি ডাইভারশনের পথে নেমে ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় যখন এসেছে তখন উল্টোদিক থেকে আমাদের মুখোমুখি হর্ন বাজিয়ে একটি আর্মী জীপ উপস্থিত হল। আমরা সঙ্গে সঙ্গেই পিছিয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু জীপটি না এগিয়ে সেও পিছিয়ে গেল এবং আমাদের এগুতে বলল। আমরা যেই একটু এগিয়েছি জীপটি তখন আবার নেমে এসে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ালো। আমরা তখন পিছনে চালিয়ে একেবারে বড় রাস্তায় উঠে অপেক্ষা করতে লাগলাম। জীপটিও পিছনে পিছনে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের এগিয়ে আসতে বললো, কিন্তু আমরা ভয়ে এগুলাম না। তখন জীপটি এগিয়ে এল, বড় রাস্তায় পড়লো এবং আমাদের গাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে চললো। আমাদের গাড়ি পেরুবার সময় জীপের মধ্যে কয়েকজনের অট্টহাসি শুনলাম। এবং হঠাৎ একটি শুন্য মদের বোতল রাস্তায় এসে পড়ে ভেঙে খান খান হয়ে গেল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের গাড়িতে কোন আঘাত লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছে দেখলাম, দেশে একটি কিছু যেন ঘটবে সকলেই তার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। বিভিন্ন লোক, শিক্ষক এবং ছাত্র যুথবদ্ধ হয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। কথাবার্তা চলছে। আশা এবং আকাঙ্ক্ষা ও উভয়ের মিলন ঘটলে যে এক রহস্যময়তার সৃষ্টি হয় তখনকার সময়ে সেই রহস্যময়তা ছাড়িয়ে ছিল। শুনলাম পরের দিন ২৪ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র এবং শিক্ষক সম্মিলিতভাবে একটি সভা আহবান করেছে, যে সভায় ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবে।

পরের দিন বিকেলে শহরে মিটিং ছিল। আমরা সবাই সেখানে গেলাম। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হল। বক্তৃতা করলেন অনেকে। সভা চলাকালে হঠাৎ খবর এলো সমুদ্র বন্দরে পাকিস্তান থেকে আগত জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামানো হচ্ছে এবং বাঙালি শ্রমিকদের সঙ্গে পাকিস্তানী সেনাদের সংঘর্ষ বেধেছে। আমরা খবর পেলাম যে, জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামাতে আপত্তি করায় বাঙালি শ্রমিকদের উপর গুলি চালানো হয়েছে এবং অনেক নিরীহ লোক নিহত হয়েছে। মাঝপথে আমাদের সভা ভেঙে গেল। আমার ছোট মেয়ে এবং জামাতা দেব পাহাড়ে থাকতো। আমি গাড়ি নিয়ে সেখানে গেলাম এবং তাদেরকে আমার সঙ্গে ক্যাম্পাসে নিয়ে এলাম। দুর্ঘটনার মুহূর্তে আমি আমার ছেলেদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চাইনি। সবাইকে তাই একত্রিত করেছিলাম। বড় মেয়েকে তো আগের দিনই ঢাকা নিয়ে এসেছিলাম। পরের দিন ছোট মেয়েকে। যা হোক সেদিন শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফেরা খুব সহজ হয়নি। আমাদের যাবার পথে ক্যান্টনমেন্ট পড়ে। সেসব রাস্তায় চলাচল ব ছিল। বড় বড় গাছ কেটে এবং আড়াআড়ি কিছু ট্রাক সাজিয়ে রাস্তায় চলাফেরা বিঘ্নিত করা হয়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে গ্রামের কাঁচা মাটি এবং খোয়া ফেলানো পথ দিয়ে অনেক সময় নিয়ে রাত প্রায় ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে ফিরলাম। রাতের বেলা গ্রামের পথ দিয়েই গিয়েছিলাম। সুতরাং আশেপাশে জঙ্গল এবং বন্যফুলের সমারোহ চোখে পড়েনি, কিন্তু তাদের গ পেয়েছিলাম। একজন ইংরেজ কবি এরকম অবস্থার বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ “শংকিত পথে অকার ফুলগুলো কোন আশ্বাস আনে না। তাদের সুগ ক্রমশ হারিয়ে যায় পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে।”

পঁচিশ তারিখ সারাদিন মানুষের আনাগোনা চলছিল বিভিন্ন এলাকায়। শহর থেকে রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ এসেছিলেন। স্যার দিকে ইষ্ট বেঙ্গল রাইফেলস-এর একটি প্লাটুন বর্ডারের রক্ষণাবেক্ষণনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিল। গ্রামের লোকেরা এদের জন্য প্রচুর খাবারের ব্যবস্থা করলো। তখন আমাদের সকলের মধ্যে একটি মাত্র বিশ্বাস সমুচ্চারিত যে আমরা বাংলাভাষী এক ও অভিন্ন। যারা বাংলায় কথা বলে তাদের সকলেই এখন একত্রিত হবে একটি বিশ্বাসের সচলতায় যে এ দেশ আমার। আমার মনে হয় তখন এই বিশ্বাসটি নির্মাণ করতে হয়নি, স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবেগের অন্তঃসার হিসাবে উৎসারিত হয়েছে। আমরা তখন চিন্তা করছিলাম না ভবিষ্যতে আমাদের কি হবে। আমরা একটি আন্তরিক ভাবাবেগের প্রবল প্রবাহকে আশ্রয় করেছিলাম। সারাদিন বিভিন্ন সময় আমরা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। যোগাযোগের স্থান ছিল দুটো- ইত্তেফাক অফিস ও মুজিবুর রহমানের বাড়ি। কিন্তু স্যার একটু পরে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখনই ভয় হয়। কিছু একটা হতে পারে তা আমাদের অনুমান করার সাধ্য ছিল না। বিপদের আশঙ্কা আমরা ব্যাখ্যা করি ঝড় আসবে বলে। এ দেশে আমরা প্রকৃতির তাণ্ডবকে দেখেছি। তাই প্রকৃতির উপমা আনি, আমরা বলি ঝড় আসবে, প্রচণ্ড সব বৃক্ষ উৎপাটিত হবে, লোকালয় ধুলায় আচ্ছাদিত হবে, বন্যায় গৃহাঙ্গন প্লাবিত হবে। সে বিপদকে রোধ করতে পারে না। সে ভেসে যায় এবং ধ্বংসের লীলা-নৈপুণ্যে সে নিশ্চিহ্ন হয়। আমার এক বিদেশী বু সব সময় বিপর্যয়ের সঙ্গে পাহাড় ভেঙে পড়ার উপমা দিতেন। তিনি ছিলেন জার্মান হাইডেলবার্গের লোক। চতুর্দিকে সব সময় পাহার দেখতেন তাই পাহারের কথাটি তার অনিবার্যভাবে মনে পড়েতো। তিনি বলতেন, পাহাড় যখন ভেঙে পড়ে তখন প্রস্তর খণ্ডগুলো প্রচণ্ডবেগে নিম্নাভিমুখে ছুটতে থাকে। তার গতিরোধ করার সাধ্য কারো থাকে না। পাথরগুলো প্রচণ্ড গতিতে সম্মুখের সমস্ত কিছুকে নিশ্চহ্ন করে ছুটে চলে। ধ্বংসের অনিবার্যতা তো একেই বলে।

২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমরা প্রায় সারা রাত জেগেই কাটিয়েছিলাম। রাত ১টা পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন জনের বাড়িতে বসে আলাপ-আলোচনা করেছি কর্তব্য নির্ধারণের জন্য। কিন্তু সুস্পষ্টভাবে কিছুই নির্ধারণ করতে পারিনি। একটি প্রধান চিন্তা ছিল ক্যাম্পাসে অবস্থানরত বিভিন্ন পরিবারকে কিভাবে রক্ষা করা যায়। এখনও তো সম্ভাব্য ভয়াবতার চিত্র উদঘাটিত হয়নি। তাই আমরা দ্রুত রাতের অবসান চাচ্ছিলাম। এবং দিনের আলোয় কর্তব্যের কথা চিন্তা করব ভেবেছিলাম। সে সময়কে রূপক করে বলা যায়, আমাদের দক্ষিণ দিকে নিস্তব্ধতা, বামদিকে নিস্তব্ধতা, আমাদের সম্মুখ ও পশ্চাতে নিস্তব্ধতা। শুধু আমাদের মাথার উপর আকাশে বাংলা বর্ণমালার সবক’টি অক্ষর ছড়িয়ে আছে। সেখান থেকেই বেদনা ও প্রতিবাদের শব্দগুলো সংগ্রহ করতে হবে।

রাত কাটলো সুগভীর নিদ্রায় নয়, তন্ত্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। প্রায় জেগে উঠেছি আশঙ্কায় এবং বিমূঢ়ভাবে। সকালে শয্যা ছেড়ে মাঠে কবুতরের খাঁচার দিকে এগিয়ে গেলাম। এটা আমার রোজকার অভ্যাস। দরজা খুলে গম অথবা ধান মাঠে ছিটিয়ে দেই, কবুতরগুলো প্রচুর পবিত্র শুভ্রতায় শেফালী ফুলের মতো খাদ্যকণার উপর ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। কবুতরের ঘরের দরোজা খুলে দিয়ে মাঠের মধ্যে ধান ছড়িয়ে আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম কিন্তু কবুতরগুলো খাবারের দিকে এগিয়ে এল না। ওরা খাঁচার সামনে একটু ঘুরে ওদের ঘরের ছাদের ওপর বসলো। ১২টির মতো কবুতর ছিল। সবক’টি প্রায় সাদা, একটি দুটি খয়েরী রঙের। হঠাৎ কবুতর ক’টি এক সঙ্গে উড়তে লাগলো। পাখা ঝাপটিয়ে প্রথম একটি উড়লো, পরে দোতলা বাড়ির ছাদ পর্যন্ত উড়লো। পরে সবকটি পাহাড়ের মধ্যে ক্রমশ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল। আমি আমার জীবনের এরকম দৃশ্য কখনও দেখিনি। সে-মূহূর্তে আমি জানলাম যে, ঢাকায় ভয়ানক কিছু ঘটেছে এবং আমাদের জীবনেও আমরা একটি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ দিকে প্রায় লাগোয়া ছিল ক্যান্টনমেন্ট। আমরা রোজই দেখতাম যে হেলিকপ্টার উড়ে ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছে এবং যাবার সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার উপর কয়েক বার ঘুরে যাচ্ছে। তাছাড়া কুমিরার দিক থেকে পাকিস্তানী সৈন্য চলাচলের সংবাদও পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথম কয়েকদিন চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কবলিত হয়নি। সে সময় মেজর জিয়া নামক একজন সৈনিকের নাম শুনছিলাম যিনি কালুরঘাটে ঘাঁটি স্থাপন করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করছিলেন। পঁিচশ তারিখে জিয়াউর রহমান অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ব্যাটালিয়নের সকল সৈন্যকে একত্রিত করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবার সংকল্প ঘোষণা করেন। তারপর তিনি কালুর ঘাটে যান এবং সেখানে বাঙালি সৈনিকদের সংঘবদ্ধ করেন। কালুরঘাটে ট্রান্সমিশন স্টেশন ছিল। সেখান থেকে জিয়ার কণ্ঠে আমি প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী শুনতে পাই তিনি ঘোষণা করেন যে- “আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছি। আপনারা যে যেখানে আছেন, সামরিক ও বেসামরিক লোকজন, আপনাদের সহযোগিতা আমাদের কাম্য। সবাইকে অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।” জিয়াউর রহমান তাঁর সেই ঘোষণায় বিশ্বের শান্তিকামী দেশগুলোর সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করলেন এবং স্বদেশবাসীকে স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে বললেন। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা-বাণী যখন আমি শুনলাম সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের আশা ও উদ্দীপনার একটি তীব্রতম মুহূর্ত ছিল। যখন চতুর্দিকে বিশৃঙ্খলা এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের অভাব ঠিক সেই মুহূর্তে জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার দাবী একটি বিস্ময়কর অভিভূত মানসিকতার সৃষ্টি করেছিল। আমি তখন ভাবতে পেরেছিলাম যে কোন কিছুই হারিয়ে যায়নি। আবার সবকিছু ফিরে পাবার সম্ভাবনা আছে। অভিভূত অবস্থায় আমার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। একজন অপরিচিত সৈনিকের কণ্ঠস্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আমাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা এনে দিল। আজ এতদিন পরে সেই মুহূর্তেই বিহ্বল মানিসকিতা ব্যাখ্যা করে গুছিয়ে বলতে পারব না। বর্তমানে এই স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে বহু কাল্পনিক উপকথার সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু আমার চৈতন্যে জিয়ার কণ্ঠস্বর আজও অনুরণন বিদ্যমান রেখেছে। এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, বিশ্ববাসী জিয়ার কণ্ঠস্বরই শুনতে পেয়েছিলেন। এবং তার ফলে বিশ্বের সর্বত্র বাংলাদেমের সপক্ষে প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়েছিল। যে মুহূর্তে চরম অসহায়তার মধ্যে আমাদের সময় অতিবাহিত হচ্ছে এবং আমরা ভাবতে সক্ষম হচ্ছিলাম না কী করে প্রতিরোধ গড়ে তুলব বা মুক্তি পাব, ঠিক সে সময়ই জিয়ার ঘোষণায় আমাদের অস্তিত্বের জন্য একটি স্বীকৃতি নির্মাণ করলো। আমাদের কিছু নেই তবু যেন মনে হলো আমাদের সব আছে, যেহেতু আমাদের ইচ্ছা আছে এবং বাঁচবার সাধ আছে। সুতরাং আমাদের সবই তো আছে। অসহায় মুহূর্তে আমাদের জন্য এই বরাভয়টি একান্ত প্রয়োজন ছিল। আমার জীবনের সকল মুহূর্তে যেন একটি মুহূর্তে একাকার হয়েছিল। আমি জীবনকে অনুভব করতে পেরেছিলাম এবং অশ্রুসজল দৃষ্টিতে সময়কে অভিষিক্ত করেছিলাম।

জিয়াউর রহমান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এবং কৌশলে বাঙালি সৈনিকদের একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে সকলকে একত্রিত করে বিদ্রোহ ঘোষণা জিয়াউর রহমানই প্রথম করেছিলেন। ৮ বেঙ্গলে যেসব পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার ছিলেন তাদের তিনি গ্রেফতার করেছিলেন। ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া সে সময় বী হয়েছিলেন। তাকে পরে হত্যা করা হয়েছিল। সংকট মুহূর্তে চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মধ্যেই একজন সেনাপতির দক্ষতা ও চাতুর্য প্রমাণিত হয়। জিয়াউর রহমান সেই দক্ষতা ও চাতুর্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অবস্থান ক্রমশ শংকাকুল হয়ে পড়ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের বাসগৃহগুলোকে অরক্ষিত রেখেই ৩০ মার্চ সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে। কুণ্ডেশ্বরী রাউজান থানার অন্তর্গত। কুণ্ডেশ্বরীর মালিক বাবু নতুন চন্দ্র সিংহ আমাদের সবার আশ্রয়ের জন্য ব্যবস্থা করে আনন্দিত হয়েছিলেন। কুণ্ডেশ্বরী বিদ্যালয়টি একেবারেই বড় সড়কের পাশে সম্পূর্ণ অরক্ষিত। রাত্রিবেলা প্রায়ই নানাবিধ শংকায় আমাদের জেগে উঠতে হতো। এদিক-ওদিক সৈন্য চলাচলের সংবাদ শুনতাম। কখনও বিদ্যালয় গৃহটি আক্রান্ত হবে এমন আশংকার খবর আসতো। শেষ পর্যন্ত সকলের পরামর্শে আমরা কুণ্ডেশ্বরী পরিত্যাগ করে প্রথমে নাজিরহাট এবং কাঁটাখালি হয়ে রামগড়ে উপস্থিত হলাম। আমরা কুণ্ডেশ্বরী ছাড়লাম ৭ এপ্রিল তারিখে। সে সময় একটি সিদ্ধান্তে আমাদের আসতে হয়েছিল। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম কোন গ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকব। শেষ পর্যন্ত বিবেচনা করা হয় যে সীমান্ত এলাকায় যাওয়াই ভাল। কেননা সেনাবাহিনী আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করছে এবং গ্রামাঞ্চলে গিয়েও আমরা রক্ষা পাব না। সীমান্তে যদি যাই তাহলে প্রয়োজনবোধে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতীয় এলাকায় যাওয়াই ভাল। রামগড়ে পৌছে জিয়াকে প্রথম চাক্ষুষ দেখলাম। তাঁর চোখে কালো চশমা ছিল এবং মুখ ছিল শ্মশ্রুমণ্ডিত। তিনি বিশেষ কোন কথা বলেননি।

পহেলা বৈশাখ তারিখে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করার নির্দেশ পেলাম। জিয়াউর রহমান আমাদের জানালেন যে, কোন সিভিলিয়ানের তখন আর রামগড়ে থাকা নিরাপদ নয়। কেননা অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পাকিস্তানী বাহিনী সেখানে এসে পড়বে। আমাদের পরিবার-পরিজনের জন্য বাসের ব্যবস্থা করে আমি, ড. মল্লিক, তৌফিক ইমাম এবং আরো কয়েকজন রামগড়ের সীমানা পেরিয়ে আমরা আগরতলার দিকে রওয়ানা হলাম। এ সময়কার একটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই যে সাবরুমের রাস্তায় একদল ভারতীয় স্কুল ছাত্রের সাক্ষাৎ। ছাত্ররা আমাদের জীপ থামিয়ে জীপের চারদিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গান করতে লাগলো। ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবে।’ সিকান্দার আবু জাফর এই গানটি লিখেছিলেন কিছুদিন আগে। তখন এ গানটির তাৎপর্য বুঝতে পারিনি। অপরিচিত পরিমণ্ডলে শংকিত সময়ের প্রেক্ষিতে গানটির বাণী আমার কাছে অসাধারণ তাৎপর্যবহ মনে হলো। আমার মনে হলো ঠিক এমন করে হৃদয়ের সর্বস্ব দিয়ে কেউ হয়তো তার জাতির বেদনাকে রূপ দিতে পারেনি। সে-মুহূর্তে ইমোশন প্রবল ছিল। তাই হয়তো গানটিকে অসাধারণ মনে হয়েছিল। তবে অসাধারণ তো বটেই, তার কারণ- আমাদের সংকটের মুহূর্তে এ- গানটি আমাদের জন্য সমর্থন ও সহায়তা এনেছিল। আগরতলায় আমাদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় এম. আর. সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি এবং মাহবুব আল চাষী আগরতলায় একটি বাংলাদেশ মিশন খুলেছিলেন। আমাদের পরিজনবর্গ আগরতলায় এসে পৌঁছায় বিকেল বেলায়। প্রথম রাতের জন্য আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম আগরতলা গ্রান্ড হোটেলে। নামটি গ্রান্ড কিন্তু কর্মব্যবস্থা অত্যন্ত সাধারণ এবং মলিন। হোটেলটি ছিল আগরতলা রাজপরিবারের। সে-রাতেই আমাদের সাথে দেখা করেন মওদুদ আহমদ ও সাদেক খান। একটু বেশি রাতে এম. আর. সিদ্দিকী সাহেবও হোটেলে এলেন এবং পরের দিন তিনি কলকাতায় যাবেন বললেন। আমাদের প্রস্তুত থাকতে বললেন। আমরা একরাতই গ্রান্ড হোটেলে ছিলাম। পরের দিন আগরতলার সরকার পরিসংগড়ে একটি পলিটেকনিক স্কুলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

আমি যে মাস পর্যন্ত আগরতলায় ছিলাম। সে-সময় দু’বার সাবরুমে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মব্যবস্ততা দেখতে এসেছিলাম। আমার সঙ্গে রশীদুল হক ছিলেন। জিয়াউর রহমানকে সে-সময় আবার দেখলাম দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্ব মুহূর্তে ব্যাকুল ও কর্মতৎপর। জিয়াউর রহমান একজন আশ্চর্য নিষ্ঠাবান সৈনিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতাও প্রমাণিত হয়েছে কয়েকটি অবস্থায়। বাংলাদেশে সৈনিকদের সংখ্যা ছিল কম। সুতরাং অনবরত সংঘর্ষের মুখে এদের ঠেলে না দিয়ে তিনি এদেরকে সংঘবদ্ধ করেছিলেন। এই সংঘবদ্ধ করার মধ্যে তিনি যে কৌশল প্রমাণ করেছিলেন তা অনন্যসাধারণ। প্রথমে কালুর ঘাটে একত্রিত করেছিলেন, পরে রামগড়ে। এবং রামগড় যখন আক্রান্ত হল তখন ভারতীয় এলাকা সাবরুম থেকে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করলেন। হতাহতের সংখ্যা যাতে আমাদের পক্ষে কম হয় সেদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। সম্পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়ে তিনি ঐকান্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন বলে জয়ের সম্ভাবনা আমাদের সহজ হয়ে আসছিল। আমি কলকাতায় চলে যাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জিয়াউর রহমানের আর দেখা পাইনি। মে মাসের শেষে আমি কলকাতায় যাই এবং পাম এভিনিউতে ব্যারিস্টার সালামের বাড়িতে অবস্থান করতে থাকি। সালাম সাহেবের ওখানে বাংলাদেশের তিনজন ছিলাম আমি, মওদুদ আহমদ এবং সাদেক খান। কলকাতায় থেকে ভারতের বিভিন্ন শহরে গিয়েছি এবং বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রেখেছি।
আমি স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরতে পারিনি। তখন সকলেই দ্রুতগতিতে দেশমুখী হচ্ছিলেন। তাই ইন্ডিয়া এয়ার লাইনসে পর্যায়ক্রমে সকলের ব্যবস্থা হয়েছিল। আমি জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখে দেশে ফিরেছি। দেশে ফিরে মনে হয়েছিল একটি নতুন প্রত্যুষে আমি যেন নতুন সূর্যোদয় দেখছি। ঠিক সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার কথা ব্যাখ্যা করে বলতে পারব না। একটি নতুন চৈতন্যের প্রান্তরে আমি নিজেকে উপস্থিত দেখে অভিভুত হয়েছিলাম।

দেশে ফিরে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে অনেকদিন সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিযুক্ত হয়েছিলেন যখন দেশে শেখ মুজিবের প্রশাসন চলছে। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের মধ্যে ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা চলছিল। যে ছাত্রদলটি সরকারী সাহায্যপুষ্ট হয়ে অত্যন্ত হিংস্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে অরাজকতার সৃষ্টি করছিল তাদের তাড়নায় প্রশাসনকে গ্লানিমুক্ত রাখা কঠিন হচ্ছিল। যে কাজগুলো একান্তভাবে ছাত্রদের নিজস্ব সেখানেও কতৃêপক্ষের হস্তক্ষেপ ঘটছিল। হলে ছাত্র সমিতির নির্বাচন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বার্ষিক নির্বাচন কোনটাতেই নিরপেক্ষতা ছিল না। ব্যালট বাক্স ছিনতাই, পরাজয়ের সম্ভাবনা হলে অস্ত্র ব্যবহার করে জয়লাভের চেস্টা- এটা একটা রীতিতে পরিণত হয়েছিল। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সমস্ত অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছিলাম। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল যে, দেশের নেতৃপদে যারা নিযুক্ত তাদের পারিবারিক অধিকার ছাত্রদলের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি বিশেষ ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিত যারা, তাদের নীতিবিরোধী বিরোধী বিশৃংখলা আচরণ ও হঠকারিতা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রদল নির্বাচনে জয়লাভ করে তারা ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অঙ্গদল। একই ছাত্রলীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একটি সরকার পক্ষে যোগ দিল এবং অন্যটি একটি বিরোধী পক্ষ নির্মাণ করলো। এই বিরোধী পক্ষটাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল ছিল। এদের প্রতাপ খর্ব করবার জন্য সরকারপক্ষীয় ছাত্রদল বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে প্রবেশে করে অরাজকতার সৃষ্টি করতো। এই অরাজকতার চরম পরিণতিতে রোকন নামক কেন্দ্রীয় সংসদের সম্পাদক নিহত হয়। তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ সমস্ত ঘটনায় আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম সকল প্রকার অন্যায়-প্রতাপের অবসান হোক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে সরকারী হস্তক্ষেপ ব হোক। দুর্ভাগ্যক্রমে তা হবার ছিল না। দেশ স্বাধীন হবার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদলকে সরকারী হিংস্রতার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা সেই যে শুরু হয়েছিল আজও তার উদ্যম ব্যাহত হয়নি। সরকারী ছাত্রদলের চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার দরুন ১৯৭৫ সালে আমি উপাচার্য পদ থেকে অপসারিত হই। আমি আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পূর্বতন কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করি।

চট্টগ্রাম থাকতে কক্সবাজারের পথে চুনতি বলে একটি এলাকায় একজন সূফীর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটলো। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী এবং সর্বত্যাগী পুরুষ ছিলেন। এঁর এখানে জিয়াউর রহমানের নাম নতুন করে শুনলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান চুনতির শাহ সাহেবের দোয়া চেয়েছিলেন। একথা ওখানকার লোকেরা আমাকে জানালো তাছাড়া আর একটি ঘটনার কথা আমি শুনলাম যে, কুমিল্লা থেকে একটি একটি হেলিকপ্টার যোগে চট্টগাম আসার পথে হেলিকপ্টারটি যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য চুনতিতে নামতে বাধ্য হয়। হেলিকপ্টারটি বিকল হয়ে যায় কিন্তু জিয়াউর রহমান অক্ষত থাকেন। এর ফলে চুনতি শাহ সাহেবের প্রতি জিয়াউর রহমানের একটি প্রগাঢ় ভক্তি সৃষ্টি হয়। এই ভক্তিটি শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। আমি কোন অলৌকিক ঘটনার কথা বলছি না। কিন্তু একজন মানুষের বিশ্বাসের সরলতার কথা বলছি। চুনতির শাহ সাহেব আমাকে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই লোকটি আন্তরিকভাবে একজন বিশ্বাসী মুসলমান। আল্লাহ্‌ তা’আলা নিশ্চয়ই একে সাহায্য করবেন।” জিয়াউর রহমানের কাছেও আমি চুনতির শাহ সাহেবের সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। বাংলাদেশের বিভিন্ন পীরদের খানকা আছে। এই খানকাগুলোর কোন কোনটা মূলত রাজনৈতিক এবং জাগতিক । কিন্তু চুনতি ছিল সর্বত্যাগী মানুষদের আশ্রয়স্থল। চুনতির শাহ সাহেবের জাগতিক এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না। জিয়াউর রহমানের মুখে এ- কথা আমি যেমন শুনেছি, আমি নিজেও এর প্রমাণ পেয়েছি। যথার্থ ত্যাগ ও বিনয়ের সাথে আল্লাহর পথে অগ্রসর হওযা কাকে বলে চুনতির শাহ সাহেব ছিলেন তার নিদর্শন। জিয়াউর রহমান তা জানতেন এবং সে জন্য চুনতির শাহ্‌ সাহেবের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ছিল।

১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়, সংবাদপত্রের সরকারীকরণ হয় এবং একনায়কত্বের নিষ্ঠুর লীলা বৈচিত্র্যের পটভূমি প্রস্তুত হয়। পার্লামেন্টে আইন পাস করে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করা হয়। এজন্য জনসাধারণ প্রস্তুত ছিল না। দেশের অগণিত মানুষের কোন অঙ্গীকার এখানে ছিল না। শুধুমাত্র ক্ষমতালোভী দর্পীরা নিজেদের অধিকার চিরস্থায়ী করবার জন্য বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। সেই সময় যেভাবে এ দেশের দুর্বল মানুষ বাকশালকে স্বাগত জানিয়েছিল তা আমাদের জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্ক হয়ে চিরদিন বিদ্যমান থাকবে।

১৩ আগস্ট ’৭৫-এ আমি ঢাকায় এলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভাইভা পরীক্ষা নেয়ার জন্য। আমি টি.এস.সি গেস্ট হাউসে অবস্থান করছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখি প্রচুর আয়োজন চলছে। শুনলাম ১৫ আগষ্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারী সম্প্রদায় আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ মুুজিবের সামনে বাকশালে যোগদান করবেন সেজন্য ব্যবস্থা চলছে। টি.এস.সিতে স্যায় আমার কক্ষে বাংলা বিভাগের সানজিদা খাতুন দেখা করতে এলো। সে জানালো যে, সে বাকশালে যোগ দেবে না। আমি বললাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরীর শর্তের মধ্যে বাকশাল যোগ দেয়ার কথা নেই। তাছাড়া বাকশালে যোগ দেয়ার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন নির্দেশ নেই। সুতরাং যারা যোগ দেবেন তারা নিজ দায়িত্বেই যোগ দেবেন এবং যারা যোগ দেবেন না তারাও নিজ দায়িত্বেই যোগ দেবেন না। আমি এর বেশি কিছু বলিনি। পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে ভাইভা নিয়ে বেরিয়ে আসছি যখন, তখন কয়েকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। তখন একটা জীপ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উপস্থিত ছিল। জীবটি তখন কতকগুলো ছেলের পিছনে ধাওয়া করলো। আমি স্যায় বিমর্ষ অবস্থায় আমার কক্ষে একাকী অবস্থান করছিলাম। সে সময় জনাব শহীদুল্লাহ নামে একজন খ্যাতনামা প্রকৌশলী আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। শহীদুল্লাহ্‌ সাহেব রাজনীতির একজন অত্যন্ত সুচতুর ব্যাখ্যাকার। তিনি আমার সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন। বললেন, “দেশে গভর্নর প্রথা চালু হয়েছে। বাকশালও একটা স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে যাচ্ছে। এর ফলে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আরো অর্ধশতাব্দী কাল নিজেদের শাসন কায়েম রাখবে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু সমস্ত কিছুই এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল, তাই সে ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটলে সকল পরিকল্পনা ভেঙে যাবে।” আমি শুধু বললাম, “আমরা দেশকে স্বাধীন করেছিলাম দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। ব্যক্তি বিশেষ অথবা কোন পরিবারের অথবা কোন দলের কল্যাণের জন্য নয়। কিন্তু বর্তমানে দেশের মানুষ অস্বীকৃত হচ্ছে একটি পরিবার এবং সে সঙ্গে উক্ত পরিবার শাসিত একটি দল দেশের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসছে এই রুদ্ধশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্ত না হলে সাহিত্য-সংস্কৃতিরও বিকাশ ঘটবে না।”

পনের তারিখে খুব সকালে রেডিও খুলে পরিবারস্থ সকল সদস্যসহ শেখ মুজিরে নিহত হবার সংবাদ পেলাম। প্রথমে অবিশ্বাস জেগেছিল। পরে হতভম্ব হয়েছিলাম। কিছুতেই এ অবস্থাকে জীবনের স্বাভাবিক গতিধারায় সাথে মেলাতে পারছিলাম না। তবে কথা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীতে বিস্ময়ও ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিকতা পায়। আবার লোকজন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা আরম্ভ করলো। নতুন প্রশাসনকে প্রায় সকলেই সমর্থন জানালো। এর কয়েক মাস পর আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হলাম। তখনই একদিন দেশে আবার সংঘর্ষের সুত্রপাত ঘটে। খোন্দকার মোস্তাক সরে যান। খালেদ মোশাররফ ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তার পতন ঘটে এবং জিয়াউর রহমান চীপ স্টাফ নিযুক্ত হন। প্রধান বিচারপতি সায়েম সাহেব রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। ডি.সি.এম.এল. এ হিসাবে জিয়াউর রহমান তখন অন্য কয়েকটি বিষয় ছাড়াও ফাইন্যান্স এবং শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলি দেখছিলেন। সেইসূত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুদান বৃদ্ধির দাবি নিয়ে আমি ইংরেজি বিভাগের আমানুল্লাহ্‌ আহমদকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ক্যান্টনমেন্টে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। মুক্তিযুদ্ধের পর এই প্রথমবার জিয়াউর রহমানের মুখোমুখি হলাম। আমি আমার পরিচয় দিলাম এবং মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর সাথে যে সাক্ষাৎ হয়েছিল সেকথা বললাম। তিনি আমার কথাগুলো শুনলেন কিন্তু মন্তব্য করলেন না। পরে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো বললাম এবং আর্থিক ঘাটতির অবস্থা ব্যাখ্যা করে বিশেষ অনুদানের জন্য আবেদন জানালাম। তিনি আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি টেলিফোন করলেন। পরে জানালেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি হল নির্মাণের জন্য এবং একটি স্পোর্ট প্যাভেলিয়ানের জন্য অর্থ সাহার্য তিনি মঞ্জুর করবেন।

আমি লক্ষ্য করলাম যে তিনি কথা বেশি বললেন না। কিন্তু তাৎক্ষণিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্তব্য সমাধান করলেন। জিয়ার চরিত্রের এই বিষয়টি আমাকে সব সময় মুগ্ধ করেছে। তিনি বেশি কথা বলতেন না। প্রয়োজনের অধিক গল্প-গুজব করতেন না এবং একান্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ দিতেন না। সেদিন জিয়াউর রহমানের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আমরা মঞ্জুরের কক্ষে গেলাম। মঞ্জুর তখন ব্রিগেডিয়ার এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ। মঞ্জুর আমার স্নেহভাজেন ছিল। এর কথা আমি আগেই জানতাম সে আমাদের কফি খাওয়ালো এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আসার বিষয় নিয়ে কিছু ঘটনা বললো।

এরপরে আমাকে প্রায়ই ঢাকায় আসতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত অথবা শিক্ষার পরিবেশ সংক্রান্ত কোন আলোচনা থাকলে ক্যাবিনেট মিটিং-এও আমাকে ডাকা হতো। একটি প্রথা তখন প্রচলিত হয়েছিল যে, ক্যাবিনেটে কখনও কখনও মন্তব্য ও উপদেশের জন্য বাইরের লোকদেরও ডাকা হতো।

জিয়াউর রহমান পরিবেশ কমিটি নামে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব ক্যাবিনেটে করেন। এই প্রস্তাবটি যখন উপস্থাপিত হয় তখন আমি ক্যাবিনেটের সভায় উপস্থিত ছিলাম। প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এবং আমাকে উক্ত কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষদের মধ্যে একজন, সরকারী কলেজের অধ্যক্ষদের মধ্যে কয়েকজন, বেসরকারী কলেজের অধ্যক্ষদের মধ্যে কয়েকজন এবং বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থা দূরীকরণের জন্য কিছু প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করা। সিলেবাস, সেশন জট, পরীক্ষায় কার্যক্রম ইত্যাদি সকল বিষয়েই কথা বলবার অধিকার এ কমিটিকে দেয়া হয়েছিল। যতদিন এই কমিটি ছিল ততদিন শিক্ষা সংক্রান্ত কোন সমস্যা দেখা দিলে কমিটি তা নিয়ে আলোচনা করতো। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গদল হিসাবে ছাত্র সংগঠন থাকা উচিত কি উচিত নয় তা নিয়েও এই কমিটি পর্যালোচনা করেছিল। এই কমিটি গঠনের ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শীতার পরিচয় পেয়েছিলাম।

জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রীসভায় যোগদানের পূর্বে আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত, তখন সরকার বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ‘ইনকোয়ারী কমিশন’ গঠন করে। আমি এই ইনকোয়ারীর বিরুদ্ধে ছিলাম; আমি জিয়াউর রহমানকে বলেছিলাম যে এই ইনকোয়ারী আইনত অসিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুসারে এই ইনকোয়ারী করবার একমাত্র অধিকার মঞ্জুরী কমিশনের। দ্বিতীয়ত ইনকোয়ারী কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে যাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল তিনি ছিলেন একজন ব্যাংকার। জীবনে তিনি কোনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাছাড়া আর একটি ব্যাপার ঘটেছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে ইনকোয়ারীর বাইরে রাখা হয়েছিল। আবুল ফজল সাহেব তখন শিক্ষা উপদেষ্ঠা হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তারই চেষ্টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইনকোয়ারীর আওতার বাইরে ছিল। আমি ব্যক্তিগতবাবে জিয়াউর রহমানের কাছে এ ব্য