শহীদ জিয়ার ছেলেবেলা

শহীদ জিয়ার জন্ম বংশ পরিচয় ও শৈশব

বিশ্বের ইতিহাসকে পর্যালোচনা করলে  আমরা দেখতে পাই, যুগ যুগ ধরে মানুষ যখন মহান আল্লাহ্তায়ালার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পাপে-পঙ্কিলে নিমজ্জিত হয় তখন পথভ্রষ্ট মানুষকে সৎপথে আনার জন্য মহান আল্লাহ্তায়ালা নবী বা রাসুলদের প্রেরণ করেছেন। আরব জাহানের লোকজন যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত, সারাদিন যখন তারা হানাহানি মারামাটি কাটাকাটিতে লিপ্ত থাকতো, মেয়ে সন্তান হলে জীবন্ত কবর দিতো, তখন সেই পথভ্রষ্ট আরবদেরকে হেদায়েত করার জন্য, অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর পথে আনার জন্য মহান রাব্বুল আলামীন তখন প্রেরণ করেছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তাঁর প্রিয়তম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে।  মিসরে ফেরাউন যখন নিজেকে খোদা বলে প্রচার করতেন এবং তাকে খোদা মানতে বাধ্য করতেন  তখন আল্লাহ্তায়ালা ফেরাউনের হাত থেকে তার বান্দাদেরকে  রক্ষা করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন হযরত মুসা (আঃ) কলিমুল্লাহকে। এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে দেদিপ্যমান।

তেমনিভাবে বিশ্বের কোন না কোন দেশের মানুষ যখন শাসক চক্রের দ্বারা হয় নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিস্পেষিত তখন মহান সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে জালেমদের হাত থেকে উদ্বার করার জন্য প্রেরণ করেন মহাপুরুষদের।

ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক গগণে যখন দুর্যোগের ঘনঘটা, ইংরেজ বেনিয়াদের অত্যাচারে অতীষ্ঠ যখন এ উপমহাদেশের মানুষ, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে যখন চলছে দুর্বার আন্দোলন, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা যখন তাদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন মরণ সংগ্রামে রত ঠিক সেই সময়ে ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলার  উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া জেলার গাবতলী থানার ছায়া ঘেরা, পাখি ডাকা, সবুজ-শ্যামল ও খাল-বিলে পরিবেষ্টিত বাগবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান ওরফে কমল। তাঁর দাদা মৌলভী কামাল উদ্দীন (কামাল পন্ডিত) নাতির নাম কমল রেখে বলেছিলেন, ‘কমল’ অর্থ পদ্ম। আমার এ পদ্ম একদিন তাঁর সৌরভ সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেবে। কালের প্রবাহে তার সেই ভবিষ্যত বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে।

মাতৃ এবং পিতৃকুলের দিক থেকে চারটি বিখ্যাত সংস্কৃতিবান পরিবারের উত্তরসরি জিয়াউর রহমান। তাঁর মাতৃকুলের পর্বপুরুষ মুহাম্মদ দানিয়েল ছিলেন বাংলার সুবাদার মীর জুমলার ভাই। ১৬৬২-৬৩ খ্রিষ্টাব্দে কুচবিহারের অন্তর্গত তদানিন্তন জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে আসাম অভিযানকালে কুচবিহারের রাজা তাকে বাধা দিয়েছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাজা মুঘল বশ্যতা স্বীকার করেন। মীর জুমলা একটি দুর্গ নির্মাণ করলেন জলপাইগুড়ির বোদা পরগনায়। মুহাম্মদ দানিয়েল তখন দিল্লীতে রাজকাজে নিযুক্ত ছিলেন। তাকে দিল্লী থেকে এনে দুর্গের সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা হয় এবং পরগনার প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয়। দানিয়েল আর দিল্লী ফিরে যাননি। তিনি বোদা পরগনার চন্দনবাড়ি গ্রামে বাসগৃহ নির্মাণ করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন এবং ক্রমান্বয়ে তার বংশধর স্থানীয় জনগণের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। মীর জুমলার সঙ্গে দানিয়েল ইরান থেকে প্রথমে আসেন দাক্ষিণাত্যের গোলকুন্ডায়। সেখানে সুলতানের অধীনে দুই ভাই চাকরি নিয়েছিলেন। দু’জনই ছিলেন সুশিক্ষিত। মীর জুমলা ছিলেন ফারসি সাহিত্যে সুপন্ডিত। রাজনৈতিক বিচক্ষণতার সুবাধে তিনি গোলকুন্ডা রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হন। তার সামরিক দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। সম্রাট শাহজাহানের হাতে গোলকুন্ডা বিজিত হওয়ার পর সেখানকার জগদ্বিখ্যাত কোহিনুর মণি উপহার হিসেবে শাহজাহানকে দিয়েছিলেন মীর জুমলা। পরে মুঘল দরবারে তিনি উচ্চপদে বহাল হন। আওরঙ্গজেব ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে মীর জুমলা বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন।

আসাম অভিযানের পর মীর জুমলা মারা গেলে তার পরিবারবর্গের অনেকেই এ দেশে থেকে যান। এভাবেই তারা এখানকার স্থায়ী জনগোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত হন। জিয়াউর রহমানের মাতৃকুলের নিকটতম পর্বপুরুষ শেখ দানেশ মুহাম্মদ উপমহাদেশে আসেন তাজাকিস্তান থেকে। তিনি প্রথমে দিল্লীতে এসে মুঘল সরকারের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। বাংলার স্বাধীন নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলে তিনি নবাব সরকারের প্রশাসনিক কাজে উচ্চতর যোগ্যতার পরিচয় দেন। তার কৃতিত্বে সন্তুষ্ট হয়ে আলীবর্দী খাঁ তাকে বোদা পরগনার ফৌজদার নিযুক্ত করেন। জিয়াউর রহমানের মাতামহ আবুল কাসেম আহমদ ছিলেন বোদা পরগনার ফৌজদার শেখ দানেশ মুহাম্মদের জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ দলিল মুহাম্মদের চতুর্থ অধঃস্তন পুরুষ। জিয়াউর রহমানের মাতামহ আবুল কাসেমের পিতা অর্থাৎ প্র-মাতামহ ইয়াকুব আলী ছিলেন সেকালের একজন আধুনিক চিকিৎসক। তিনি ছিলেন এলএমএফ ডাক্তার। শেখ উপাধি ত্যাগ করে এরা সরদার উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। সম্ভবত স্থানীয় সমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন বলেই তাদের পদবীর এই পরিবর্তন। পারিবারিক দলিল দস্তাবেজ থেকে দেখা যায়, জিয়াউর রহমানের মাতৃ এবং পিতৃকুলের পর্ব পুরুষদের মধ্যে মীর, শেখ, মীর্জা, সরদার, মন্ডল প্রভৃতি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সংমিশ্রন ঘটেছে। শেখ দানেশ মুহাম্মদ নিজের নামের শেষে সরদার কথাটি ব্যবহার করতেন।

মুঘলরা সাধারণত মীর্জা পদবী ব্যবহার করতেন। জিয়াউর রহমানের মীর্জা বংশীয় পর্বপুরুষদের মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে সঞ্চারিত হয়ে এসেছে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ। বহু গ্রন্থ প্রণেতা সুসাহিত্যিক ও আইনজীবী তসলিম উদ্দিন আহমদ ছিলেন মীর অন্য কথায় মীর্জা দানিয়েলের অষ্টম অধঃস্তন পুরুষ।

জিয়াউর রহমানের মাতৃকুলের লোকেরা বৈবাহিক সত্রে পঞ্চগড় জেলার অটোয়ারির মীর্জা বংশের সঙ্গে আবদ্ধ হন ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধনে। জিয়াউর রহমানের মাতামহ আবুল কাসেম ছিলেন ব্রিটিশ যুগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। তাদের চা বাগানও ছিল। তার সঙ্গে বিয়ে হয় রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও বাগ্মী এবং বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য মীর্জা কাদের বখশের বোনের মেয়ে রহিমা খাতুনের। এই বিদষী মহিলা ছিলেন জিয়াউর রহমানের সাক্ষাৎ মাতামহী। শৈশবে জিয়াউর রহমানের ওপর পড়ে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব। জিয়াউর রহমানের মা জাহানারা খাতুন তার মা মীর্জা বংশীয় রহিমা খাতুনের সান্নিধ্যে থেকে সংস্কৃতি চর্চায় অবদান রাখেন। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে তিনি স্বনামখ্যাত ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের পিতা মুহম্মদ মনসুর রহমান ছিলেন ব্রিটিশ যুগের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত রসায়ন বিজ্ঞানী। তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে কেমেস্ট্রি, ফিজিক্স ও ম্যাথমেটিক্স নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন ১৯২৬ সালে। পরে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে এমএসসি অধ্যয়ন করেন রসায়নশাস্ত্রে। ১৯২৮ সালে তিনি অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত আলীপুর টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে রসায়নবিদ হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৩০ সালে তার বিয়ে হয় অটোয়ারির মীর্জা পরিবারের মেয়ে জাহানারা খাতুনের সঙ্গে। জিয়াউর রহমানের পিতা মুহম্মদ মনসুর রহমান ছিলেন একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ। শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন বিনয়নম্র এবং একজন দায়িত্বশীল ও সুরুচিসম্পন্ন সুশীল ভদ্রলোক। জাহানারা খাতুনের গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তার পাঁচ পুত্র সন্তান। এদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুনের কোন কন্যা সন্তান ছিল না।

পুত্রদের উচ্চশিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে বাবা মনসুর রহমান ও মা জাহানারা খাতুনের আগ্রহ ছিল অপরিসীম। এদের সযত্ন  লালন ও পরিচর্যায় পাঁচ পুত্রই উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। জিয়াউর রহমানের বড় ভাই রেজাউর রহমান আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নৌবাহিনীতে ক্যাডেট অফিসার পদে যোগদান করেন। কয়েক বছর নৌবাহিনীতে থাকার পর ইস্তফা দিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ড যান। সেখান থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি লাভের পর ইংল্যান্ডে উচ্চপদে নিযুক্ত হন। এরপর তিনি জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থায় ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চতর পদে যোগদান করেন। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সার্ভিসে কর্মকাল শেষে অবসর নিয়ে তিনি বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন।

মনসুর রহমানের তৃতীয় পুত্র ও জিয়াউর রহমানের পিঠাপিঠি কনিষ্ঠ ভাই মিজানুর রহমান অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভের  পর ব্যাংকিং সার্ভিসে যোগদান করেন। আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের লন্ডন শাখার পরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালে সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। জিয়াউর রহমানের পরবর্তী কনিষ্ঠ ভ্রাতা খলিলুর রহমান ফার্মেসিতে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী লাভের পর আফ্রিকার জাম্বিয়া সরকারের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ডে সপরিবারে বসবাস করছেন। জিয়াউর রহমানের সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহমদ কামালও একজন গ্রাজুয়েট। তিনি পর্যটন করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার।

জিয়াউর রহমানের পিতৃবংশীয় পুরুষগণ কয়েক শতাব্দী আগে বগুড়া জেলার গাবতলী থানার  মহিষাবান গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে জানা যায়। এরা ছিলেন এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এদের ‘মন্ডল’ পদবি থেকে অনুমতি হয় পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তিগণ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ছিলেন। বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে দেখা যায়— মন্ডল পদবিধারীরা ছিলেন এদেশের আদি গ্রামীণ পঞ্চায়েত তথা স্বাধীন গ্রাম সরকারের প্রধান।

জিয়াউর রহমানের পিতৃবংশীয় পর্ব পুরুষগণ বৃহত্তর মন্ডলের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে ‘মন্ডল’ খেতাব লাভ করেছিলেন। পারিবারিক বংশ-তালিকা থেকে জানা যায়, মন্ডল পরিবারের আদি পুরুষদের মধ্যে মুমিন উদ্দিন মন্ডল ছিলেন গাবতলী, সুখানপুকুর ও যমুনার পশ্চিম তীরবর্তী এলাকার একজন প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় নেতা। তার তৃতীয় অধঃস্তন বংশধর ছিলেন কাকর মন্ডল। ইনিও এই অঞ্চলের একজন স্বনামখ্যাত নেতা ছিলেন। ইনি জিয়াউর রহমানের প্রপিতামহ। কাকর মন্ডলের একমাত্র পুত্র কামালউদ্দিন মন্ডল ছিলেন একজন খ্যাতনামা সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ। ইনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের পিতামহ। সেকালে নর্মাল ডিগ্রি লাভের পর তিনি অশিক্ষা ও কুসংস্কারে জর্জরিত এখানকার অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলে প্রথম আধুনিক শিক্ষার জ্ঞানবর্তিকা প্রজ্বলিত করেন। শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকার জন্য এ এলাকায় আজও তিনি এক প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ।

গাবতলী থানার বাগবাড়ি গ্রামের এক প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পরিবারের ধনাঢ্য উত্তরসরি করিম বখশ তালুকদারের কন্যা মিসিরউন্নিসা বেগমের সঙ্গে বিবাহসুত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন কামাল উদ্দিন মন্ডল। করিম বখশ তালুকদারের কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। একমাত্র কন্যা মিসিরউন্নিসাই তাঁর সমস্ত জোত-জমির উত্তরাধিকারী ছিলেন। করিম বখশ তালুকদারও গভীর শিক্ষানুরাগী এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য সুখ্যাতি অর্জন করেন। কামাল উদ্দিনের শিক্ষাগত যোগ্যতায় আকৃষ্ট হয়ে তিনি তাঁকে কন্যার জামাতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এভাবে গাবতলীর তালুকদার ও মন্ডল পরিবার ঘনিষ্ঠতর হয় আÍত্মীয়তা সত্রের সুবাদে। বিয়ের পর কামাল উদ্দিন বাগবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। তিনি কামাল পন্ডিত হিসেবে এলাকায় সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। বাগবাড়ি মাইনর স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কামাল উদ্দিন পন্ডিতের বড় চাচা শ্বশুর কলিম মাহমুদ তালুকদার। তিনি স্থানীয় সমাজে কলিম মাহমুদ নামে পরিচিত ছিলেন। জনশ্রুতি আছে একবার নাটোরের দিঘাপতিয়ার মহারাজা অর্থ সংকটে পড়লে তিনি কলিম মাহমুদের শরণাপন্ন হন। কলিম মাহমুদ মহারাজাকে কাঠের ধামা ভর্তি সোনা ও রূপার মোহর দিয়ে বিপদমুক্ত করেন।

বাগবাড়ির তালুকদার বংশের পর্ব পুরুষগণ দিনাজপুরের ঐতিহাসিক ঘোড়াঘাট অঞ্চল থেকে বগুড়ায় আসেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে। এ বংশের বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন মুহম্মদ আওলাদ মন্ডল। স্থানীয় জনগণের কাছে তিনি ‘আল্লাদি মন্ডল’ নামে পরিচিত ছিলেন। ইতিহাস দৃষ্টে মনে হয় খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতক থেকেই মন্ডল পরিবার উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের প্র-পিতামহ মুমিন উদ্দিন মন্ডল ১৮৫৭-র ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম স্বাধীনতা বিপ্লবের ১৭ বছর আগে, ১৮৪০ সালে পরলোকবাসী হন। এ সময় বাংলার দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে চলছিল শ্বেতাঙ্গ নীলকর ও দেশীয় জমিদারদের প্রজা পীড়নের বিরুদ্ধে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহ। প্রখ্যাত কৃষক নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহ ও মুক্তি সংগ্রামের বীর সেনানী সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীরের মৃত্যুর পর এ সময় কৃষক অভ্যুত্থানের নেতা ছিলেন বিপ্লবী জননায়ক দুদু মিয়া। মন্ডল পরিবারের লোকেরা স্থানীয় গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে একাÍ ছিলেন। তারা কৃষকদের ভাগ্যের সঙ্গে নিজেদের ভাগ্যকে অভিন্ন মনে করতেন। স্বাভাবিক কারণেই এরা সে সময়কার কৃষক শ্রেণীর অধিকার অন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন।

জিয়াউর রহমানের পিতামহ কামাল উদ্দিন পন্ডিত বাগবাড়িতে ৩০ বছর শিক্ষকতার পর স্বগ্রাম মহিষাবানে ফিরে এসে এ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের কাজে ব্রত হন। শিক্ষার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এ মানুষটি নিজের অনগ্রসর এলাকার উন্নয়নের জন্য নাড়িছেঁড়া টান অনুভব করেছিলেন। এখানে আসবার পরই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন একটি প্রাথমিক স্কুল। পরে এ স্কুলটি হাইস্কুলে উন্নীত হয়। এ স্কুলে তাঁর নামে একটি চেয়ার আজও সংরক্ষিত।

এলাকার কৃষক সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান, এলাকার সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত অগ্রগতি এবং সমাজ সংস্কারে কামাল উদ্দিনের অবদান অসামান্য। ব্রিটিশ যুগে পর পর দুইবার তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এটি ছিল জনসেবা, শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ উন্নয়নে তাঁর ব্যাপক কর্মকান্ডের প্রতি এলাকবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে কৃষকদের উৎসাহিত করে পাট উৎপাদনে অবদান রাখার জন্য আদর্শ ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে তদানীন্তন সরকার তাঁকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন।

কামাল উদ্দিন বৃদ্ধ বয়সে ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। সমাজ সেবায় সদা তৎপর এ কর্মযোগী পুরুষটির ওপর বয়স কখনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি। জনকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার ঐকান্তিকতা, বিচারের কাজে নীতিনিষ্ঠা এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্য আজীবন তিনি এলাকাবাসীর অপরিসীম শ্রদ্ধা অর্জন করে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে কামাল উদ্দিন ছিলেন পোশাক পরিচ্ছদে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, অর্পিত দায়িত্ব পালনে একান্ত নিষ্ঠাবান, আচার-আচরণে মার্জিত রুচিসম্পন্ন, সংস্কৃতিমনস্ক আর সত্য ভাষণে নির্ভীক ও অনমনীয়। কখনো তিনি অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করেন নি। তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী, গায়ের রং ছিল ধবধবে ফর্সা। কথা বলতেন বিশুদ্ধ বাংলায়। ছেলেমেয়েদের ডাকতেন পুরো নাম ধরে। অভিজাত ও ধনাঢ্য পরিবারের জামাই হয়েও তার জীবন-যাপন ছিল সাদাসিধে। শ্বশুর বাড়ি যাতায়াত করতেন পায়ে হেঁটেই, পালকিতে চড়তেন না। কমল অনেক সময় হেটে মহিষাবান থেকে বাগবাড়ি গেছেন তাঁর দাদার সাথে। মেঠোপথের দুপাঁশের গাছপালা, পাখি দেখিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন দাদাকে। দাদার সাথে কমলের হাঁটতে খুব ভাল লাগতো। কামাল  উদ্দিন পন্ডিতের খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে ছিল প্রচন্ড বাছবিচার। চিংড়ী মাছ খেতেন না, বলতেন ওটা খাওয়া মকরুহ। শিক্ষিত মানুষ ছেলে মেয়েদেরকে অনেক সময় নিজেই পড়াতেন। সে আমলে তাদের বীজগণিত সমন্ধে জ্ঞান দিতেন মাতৃভাষাতেই। তার পোষাক ছিল আপাদমস্তক সাদা। মুখেও ছিল ধবধবে বড় লম্বা দাড়ি। ছোট বেলায় কমল অত্যন্ত কৌতুহলী ছিলেন দাদার প্রতি। খুব লক্ষ্য করতেন তাকে। কমলের মনে হতো, চারপাশের ধলো-বালি লাগছেনা দাদাজানের শরীরে। কোন ময়লা দাগ লাগছে না, দাদাজান যেন ফুলের মত সুন্দর। যেমন ভোরবেলার নরম আলোর ভেতরে কাঠালী চাপার গাছকে ভালো লাগে। দাদাজানের সরল জীবন-যাপন ভাল লাগতো কমলের।

জিয়াউর রহমানের মাতামহী মিসিরউন্নিসা বেগমও ছিলেন বহু বিরল গুণের অধিকারিণী। তিনি ছিলেন এক তেজোস্বিনী মহিলা। পিতা করিম বখশ তালুকদারের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করেন তিনি তার সুদৃঢ় পরিচালনার গুণে। মিসিরউন্নিসা ছিলেন বাগবাড়ি এলাকার এক পরহিতব্রতী বিদ্যোৎসাহী মহিলা নেত্রী। তিনি তার সম্পত্তির আয়ের এক বিরাট অংশ সমাজ উন্নয়ন ও শিক্ষা বিস্তারের কাজে ব্যয় করে যান।

তার ও তার স্বামী কামাল উদ্দিন পন্ডিতের অনুপ্রেরণা এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই তাদের পুত্র-কন্যারা উন্নত পরিবেশে শিক্ষার সুযোগ লাভ করেন। তার প্রথম দু পুত্র মাইনর পাসের পর সাংসারিক কাজে নিয়োজিত হন। তৃতীয় পুত্র নরমাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতার পেশায় যোগদান করেন। চতুর্থ পুত্র মুহম্মদ মুয়াজ্জেম উদ্দিন কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি লাভের পর প্রকৌশলী হিসেবে বিভিন্ন উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হন। এদের পঞ্চম পুত্র রসায়ন বিজ্ঞানী মুহম্মদ মনসুর রহমানই ছিলেন জিয়াউর রহমানের পিতা। কামাল উদ্দিন ও মিসিরউন্নিসার ৬ষ্ঠ পুত্র মুহম্মদ মমতাজুর রহমান কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভের পর সেনাবাহিনীতে কমিশন পেয়ে চিকিৎসক পদে যোগদান করেন। তাদের সপ্তম পুত্র মাহফুজুর রহমান বিএসসি ডিগ্রী লাভের পর চার্টাড একাউন্টেসি প্রথম পার্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আয়কর আইনজীবীর পেশায় নিয়োজিত আছেন।

জিয়াউর রহমান ওরফে কমলরা পাচঁ ভাই। কোন বোন নেই। সব কটা ভাই-ই মেধাবী ও ভদ্র। কমল ছিলেন ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। প্রচলিত একটি গ্রাম্য প্রবাদ হচ্ছেঃ ভাই- বোনের মধ্যে যারা মেঝো বা দ্বিতীয় হয়ে জন্মগ্রহণ করে, তারা চিরদিনই একটু ঝগড়াটে অথবা হিংসুটে অথবা বখাটে বা উচ্ছৃংখল বা বদমেজাজী অথবা ত্যাদোর অথবা ছন্নছাড়া হয়ে থাকে। এক কথায় প্রাচীন মুরুব্বীদের প্রবচন অনুযায়ী ভাইবোনদের মধ্যে মেঝো বা দ্বিতীয় ভাই কিংবা বোন একটু বাড়াবাড়ি স্বভাবের বা মারদাঙ্গা স্বভাবের হয়ে থাকে। কিন্তু অবাক ব্যাপার কমলদের পাঁচটি শান্ত ভাইয়ের মধ্যে মেঝো ভাইটি কিন্তু আরো শান্ত স্বভাবের। বলা চলে সুশান্ত। একান্তই নম্র, ভদ্র ও লাজুক স্বভাবের। ঝগড়া বিবাদ এড়িয়ে চলতেন। মিথ্যা কথা বলতেন না। খেলাধুলার সঙ্গীদের মধ্যে যখনই দেখা যেত তুলকালাম কান্ড বেধে গেছে, কমল তখন নীরবে সরে যেতেন ঘটনাস্থল থেকে।

বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতার পার্ক সার্কাসে বাস করতেন কমল। চার বছর বয়সে তাঁকে ভর্তি করা হয় পার্ক সার্কাসের আমীন আলী এভিনিউতে অবস্থিত শিশু বিদ্যাপীঠে। এক বছর এ স্কুলে লেখাপড়া করার পর দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধের কারণে কলকাতায় জাপানী বোমা পড়ার ফলে কমল ও পরিবারের অন্যান্যরা ১৯৪৩ সালে বাগবাড়ি চলে আসেন। কমলকে ভর্তি করা হয় বাগবাড়ি স্কুলে। শহরের ভীড় থেকে সরে এসে শান্ত সবুজ গ্রাম। কাকের চোখের মত টলটলে পুকুর। ঝোপ-ঝাড়ে পাখির শিষ। বোমা পড়ার ভয় নেই। সাইরেনের চমক লাগানোর শব্দ নেই।  উচু তাল গাছে বাবুই পাখির বাসা। শত শত বাবুই কী অপর্ব দক্ষতায় তাদের ঘরগুলো উচুঁ গাছে ঝুলিয়ে রাখে। বিলে-ঝিলে হরেক রকমের শাপলা ফোটে, আর রাতে চাঁদ ওঠে সাদা বেলুনের মত। সবুজ পাতার আড়ালে শিস দেয় ভোরের দোয়েল। দখিনা বাতাসে দোলে ফসলের মাঠ। পায়ের নিচে নরম সবুজ ঘাস। চারদিকে সবুজের সমারোহ। চিরসবুজ সুবিনিড় ছায়াঘেরা— বাগবাড়ি।

স্কুলের শিক্ষকরা দেখলেন কলকাতা শহর ফেরৎ এই ছেলেটি বেশি কথা বলে না। গ্রামের সরল ছেলেদের উপর  হম্বি তম্বি  ফলায় না। চুপচাপ থাকে। নির্জনতা পছন্দ করে। কথা বলে আ¯ে আ¯ে। সবার সাথে সদ্ভাব। কোন অন্যায় দেখলে শান্তভাবে প্রতিবাদ করে। বাগবাড়ি স্কুলে লেখাপড়ার সময় দাদা-দাদীর বেশি সান্নিধ্যে আসেন কমল। চাচা মমতাজুর রহমানের খুব ভক্ত ছিলেন কমল। নব বধু চাচীরও খুব ভক্ত হয়ে পড়েন। সারাক্ষণ থাকতেন চাচীর সঙ্গে। রাতের বেলায় ঘুমিয়ে পড়তেন চাচীর বিছানায়।

লাজুক কমল তখন থেকেই স্বভাবতঃ কিছুটা গম্ভীর। অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়তেন না কখনোই। সবাই যখন হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়েছে, কমলকে দেখা গেছে তখন ঠোট টিপে একটু হাসতেন মাত্র। এ ছাড়া কোন রকম শিশু সুলভ দুষ্টুমি বা ঝগড়া বিবাদে কখনো জড়াতেন না। কমল অসম্ভব কৌতুহলী ছিলেন। যা কিছু দেখতেন তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন। যুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্য ফেরৎ চাচা ডা. ক্যাপ্টেন মমতাজুর রহমানের সামরিক পোশাক নিয়েও তাঁর কৌতুহলের সীমা ছিল না। বার বার নেড়ে চেড়ে দেখতেন। চাচার কাছ থেকে লড়াইয়ের কত কাহিনী মনযোগ সহকারে শুনতেন। চাচা যেন সমস্ত অন্যায়কে দূর করার জন্য একজন সৈনিক হয়েছেন। কমল মনে মনে ভাবতেন, তিনিও কি একদিন চাচার  মত ঐ রকম সৈনিক হতে পারবেন ?

১৯৪৪ সালে কমলরা পুনরায় বাগবাড়ি থেকে কলকাতায় চলে আসেন। কমলকে তখন কলকাতার কলেজ স্ট্রীটের হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। ট্রামে চড়ে কমল স্কুলে যেতেন। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত কমল হেয়ার স্কুলেই লেখাপড়া করেন। অত্যন্ত জ্ঞানপিপাসু ছিলেন কমল। হেয়ার স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় অধ্যাপক কাজী সানাউল্লাহ সাহেবের গ্রন্থাগার থেকে গাদা গাদা বই নিয়ে যেতেন এবং তা শেষ করে সাত দিনের মধ্যেই ফেরৎ দিতেন।

ভবিষ্যতে কমল রাজনীতিবিদ হবেন এমনটি পরিবারের কেউ কখনো উপলব্ধি করে নি। কিন্তু রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছেলেবেলায়ই লক্ষ্য করা গেছে। কলকাতার পার্ক সার্কাসে রাজনৈতিক দলের জনসভা হলে কমল যেতেন সেখানে। মহাতœা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্, জওহরলাল নেহেরু, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জনসভায় যেতেন বক্তৃতা শুনতে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বাড়িতেও গিয়েছেন কমল। করাচীর কনস্টিটিউশনাল এসেম্বলীর দর্শক গ্যালারীতে বসে  কিশোর বয়সেই কমল পলিটিক্যাল ডিবেট শুনতেন।

কমলের প্রিয় খাবার ছিল বাসী ভাত। পিয়াজ, কাচামরিচ দিয়ে ভেজে। মুরগির পাখনার মাংস খেতেও ভালবাসতেন। ভড়িভোজের প্রতি তাঁর কোন আকর্ষণ ছিল না। দাদার কথামত বাড়িতে তাই রান্না হতো একটি তরকারি। মোটা কাপড় পড়তে হতো। কমল চাচার সাথে খাবার টেবিলে বসে বলতেন, “এ দেশের মানুষ খাদ্য বিলাসী। পঞ্চব্যঞ্জন বা সপ্তব্যঞ্জন ছাড়া তাদের চলেনা। এটাই তাদের উন্নতিকে আটকিয়ে রেখেছে। এসব অভ্যাস বদলাতে হবে” ।

দাদাজান মৌলভী কামাল উদ্দিন (কামাল পন্ডিত) সবাইকে শিখিয়েছেন সাদাসিধেভাবে চলার জন্য। তার আদর্শ ছিল সরলভাবে  জীবন কাটানো কিন্তু উচুঁ চিন্তা করা। Plan living & high thinking— জীবনে কোন রকমের বিলাসিতা থাকবেনা। প্রাচুর্যের দাপট থাকবেনা। মানুষতো বড় হয় সম্পদের পরিমাণ দিয়ে নয়। বড় হয় তার আদর্শের জন্য, সংগ্রামের জন্য।

১৯৪৭ সালে বৃটিশের পরাধীনতার শৃংখলকে পদদলিত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে উপমহাদেশে দু‘টি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। কমলের বাবা মনসুর রহমান পাকিস্তানের পক্ষে অপসন দিয়ে করাচীতে চলে আসেন। হেয়ার স্কুলের সার্টিফিকেট তুলে বাবার সংগে কমল ট্রেনে করে এবং পরে জাহাজে করে করাচী যান। করাচীতে এক মাসের মতো ভাড়া বাসায় থাকার পর জেকব লাইনে তারা বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই কমল ‘করাচী একাডেমী স্কুলে’ সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। তখন একাডেমীর প্রিন্সিপাল ছিলেন এস,পি ভাড়া। তিনি ছিলেন ফার্সি সম্প্রদায়ের লোক। কমলকে তিনি খুব আদর করতেন। ১৯৫২ সালে এই  স্কুল থেকেই তিনি ২য় বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন ডি.জে কলেজে। কমলের ইচ্ছা ছিল ডাক্তারী  পড়ার। মামীর কাছে লেখা চিঠি থেকে সে কথা জানা যায়। চিঠিটি নিম্নরূপঃ

মামী,

এতদিন চিঠি লেখেন নাই, সেই জন্যে হঠাৎ আপনার চিঠি পেয়ে বাস্তবিকই আশ্চর্য্য হয়ে গেলাম। কিন্তু বাচ্চু মামার চিঠি এ পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই, কোথায় তিনি কি করছেন আর কবেই বা আসবেন তা জানি না।

আমি পাশ করেছি ও ডি, জে কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমার ঙঢ়ঃ. এৎড়ঁঢ় এ ইরড়ষড়মু আছে, যেহেতু ডাক্তারী পড়তে ইচ্ছুক।

জানি না ডাক্তারী পড়া হবে নাকি, কারণ আমিও আর্মিতে গুলটিন্ক হতে পারি। জানি না! আপনি কেমন আছেন? ও ছোট্ট দিদিমনিটি কেমন আছে? চিঠি পাওয়া মাত্র  উত্তর দিলে খুশি হব।

ইতি কমল।

চিঠিতে উল্লেখিত বাচ্চু মামা হচ্ছেন মেজর ডা. মঈনুল ইসলাম। তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হন। ছোট দিদিমনিটি হচ্ছে মামাতো বোন পুতুল।

কিন্তু কমলের আর ডাক্তারী পড়া  হল না। তিনি ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন।

কমলের নানা জলপাইগুড়ির বিখ্যাত ‘টি ফ্যামিলির’ জনাব আবুল কাসেম। ‘টি ফ্যামিলি’ নামটি অবশ্য মহারানী ভিক্টোরিয়ার দেয়া, কারণ এই পরিবারই ছিল প্রথম এ দেশীয় কোন চা বাগানের মালিক। নানা আবুল কাসেমের বড় ভাই আব্দুর রশিদ ছিলেন সে আমলে মোহামেডান স্পোটিং এর বিখ্যাত খেলোয়াড়। নানী রহিমা খাতুনও অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। ধবধবে ফরসা গায়ের রং, তার নাক, চোঁখ-মুখ বিদেশিনীদের মতো। কমলের মা জাহানারা খাতুন রাণী করাচী বেতারে নিয়মিত নজরুল সঙ্গীত গাইতেন। তখন হতে তিনি নজরুল গীতি ও গজল পরিবেশন করতেন। ক্লাসিক্যালও পছন্দ করতেন। তবে নজরুল গীতি তিনি বেশি গাইতেন। কাবেরী নদীর জলে কে গো বালিকা, স্নিগ্ধ শ্যাম বেণীবর্ণা, যেদিন রোজ হাশরে করবে বিচার, তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, পদ্মার ঢেউরে এমন আরও অনেক নজরুল গীতি তিনি পরিবেশন করতেন। মায়ের কণ্ঠে শোনা এসব নজরুল গীতি কমলের মনে স্নেহময়ী মায়ের মধুর স্মৃতিকে চির অম্লান করে রেখেছিল। আজীবন তিনি সঙ্গীত ভালবেসেছেন এ জন্যই। মায়ের কণ্ঠে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের গান শুনে কমল কৈশরেই কবি নজরুলের ভক্ত হয়ে পড়েন।

কমলের মা জাহানারা খাতুন রাণী গায়িকা হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। প্রখর স্বজাত্যবোধ ছিল তার মধ্যে। কমলের চাচী শরীফুন্নেসা আজগুরী খানম (বেগম মমতাজুর রহমান) স্মৃতি হাতড়ে বলেন, করাচীর বাসায় তাকে আমি এক প্যাচে শাড়ি পরতে দেখে কারণ জানতে চেয়েছিলাম। পশ্চিম পাকিস্তানীদের বৈষম্যমূলক ও অপমান জনক আচরণে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে রানী আপা জানিয়েছিলেন, ‘ওদের বোঝাতে চাই আমরা আলাদা’। কমল তাঁর মায়ের কাছ থেকে সে অহংবোধটি শতভাগ পেয়েছিলেন বলেই সময় ও সুযোগ মোতাবেক পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বে আঘাত হানতে পেরেছিলেন।

স্মৃতি থেকে কমল

ক)  বড় ভাই রেজাউর রহমানের স্মৃতি থেকে কমল

রেজাউর রহমান বকুল, কমল অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের বড় ভাই। বয়সে  কমলের দু’ বছরের বড়। ছেলেবেলায় তিনিই ছিলেন কমলের খেলার সাথী। কলকাতার পার্ক সার্কাস, বগুড়ার নিজ গ্রাম বাগবাড়ি এবং করাচীর জেকব লাইনে কেটেছে তাদের  শৈশব-কৈশোরের ষোলটি বছর । ইঞ্জিনিয়ার রেজাউর রহমানের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে জিয়াউর রহমান ওরফে কমলের ছেলেবেলার সেই সব কাহিনী। কমলের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি হারিয়ে যান অর্ধ শতাব্দীরও আগের কমলের সেই ছেলেবেলার কাহিনীতে। বললেন, কমল ও আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিন ছিল আমাদের ছেলেবেলা। পার্ক সার্কাসে কমলের ছেলেবেলার কথা বলতে গিয়ে রেজাউর রহমান বলেন, ‘কমল ও আমি হেয়ার স্কুলে পড়তাম। আমি কমলের দু’ ক্লাস উপরে। ট্রামে চড়ে কমলকে নিয়ে স্কুলে যেতাম। প্রথম প্রথম বাবা-মা আমাদেরকে কাজের লোক দিয়ে স্কুলে পাঠাতেন। কিন্তু আমরা স্বাধীন হবার জন্য অর্থাৎ একা একা স্কুলে যাবার ফন্দি ফিকির আটতাম। কমলের বুদ্ধিতে একদিন আমরা কাজের লোককে ফাঁকি দিয়ে মানুষের ভীড়ে হারিয়ে যাই। এভাবে দু’ একদিন করার পর বাবা-মা দেখলেন আমরা স্কুলে যেতে পারি। এরপর থেকে আর কাজের লোক সংগে যায় নি। স্কুলে যেতে আমাদেরকে চার আনার একটি সিকি দেওয়া হতো। পাঁচ পয়সা ছিল  ট্রাম ভাড়া। ট্রাম ভাড়া দেয়ার পর পাঁচ পয়সা থাকতো। আমি ও কমল এ পয়সা দিয়ে চীনা বাদাম ও মুড়ি কিনে খেতাম। কোনদিন স্কুলে পয়সা হারিয়ে গেলে কমলকে নিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরতাম।’

পার্ক সার্কাস ছিল কমলের ছেলেবেলার একটি স্মৃতিময় স্থান। পার্ক সার্কাসে মাঠ ছিল, পার্ক ছিল। কমল মাঠে ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট খেলায় মেতে থাকতো। খেলাধূলায় কমল খুব ভাল ছিল। বৃষ্টির দিনে কমল বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মেখে আনন্দ করতো। গ্রীষ্মের ছুটিতে পার্কের নালায় গিয়ে ইট দিয়ে ব্রিজ তৈরি করতো। পার্কের গাছ থেকে আম, জাম ও আমড়া পেরে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মজা করে খেত। শীতকালে কমল ব্যাডমিন্টন এবং গুলি-ডান্ডা খেলতো। খাবার জিনিস নিয়ে ভাইদের মধ্যে যাতে ঝগড়া না হয় সেজন্য মা পিরিজে সবার খাবার ভাগ করে দিতেন। তবে কমলের সংগে আমার টুকটাক ঝগড়া হয়েছে ছাদের উপর ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে। ছাদে কে কোন জায়গা থেকে ঘুড়ি উড়াবে এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হতো। তবে কখনোই তা মারমুখো ছিল না। খেলাধুলায় কমল মেতে থাকলেও কখনো তা সীমা ছাড়িয়ে যায় নি। বাড়ির নিয়ম  ছিল খুব কড়া। সন্ধ্যায় রাস্তায় বাতি জ্বলার আগেই  ঘরে  ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে  পড়াশুনায় বসতে হত। কমল এ নিয়ম কখনো লংঘন করেনি। পড়ার সময় পড়া আর খেলার সময় খেলা করতো কমল।

ছেলেবেলায় কমল সিনেমাও দেখতো। তবে একা নয়, বাবার সংগে। তখন কলকাতার হলগুলোতে হলিউডের ছবি চলতো। বাবা মাসে একবার আমাকে ও কমলকে নিয়ে সিনেমা দেখতেন। বাসায় মুরগির গোশত রান্না হলে কমল খুব খুশি হত। মুরগির পাখনার মাংশ খেতে কমল ভালবাসতো। পাখনাকে কমল বলতো লাঙ্গল। আমিও পাখনা খেতাম। এ জন্যে মা মুরগির পাখনা দু’টি আলাদা করে আমাদের জন্য রাখতেন। ভাত তেলানী ছিল কমলের প্রিয় খাদ্য। বাসী ভাত, পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর তেল দিয়ে ভেজে ভাত তেলানী তৈরি হতো। শীতের দিনে সকালে মা ভাত তেলানী কমলকে তৈরি করে দিতেন।

ছেলেবেলায়ই বাবা মিতব্যয়ী হওয়ার কথা বলতেন কমলকে। তাই আজেবাজে কোন খরচের দিকে কমলের মন ছিল না। স্কুলের জন্য কমলের দু’টি প্যান্ট ও দু’টি শার্ট ছিল। ময়লা হলে শার্ট-প্যান্ট কমল নিজেই ধুতেন।

আমাদের ছেলেবেলায় পার্ক সার্কাস ময়দানে রাজনৈতিক দলের জনসভা হতো। জনসভায় যেতে কমল খুব আগ্রহী ছিল। মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহেরুর জনসভায় তেমনিভাবে সে গিয়েছিল, তাদের বক্তৃতা শুনতে। ফুটবল খেলার জন্য ক্লাবের চাঁদা ওঠাতে একদিন কমল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বাড়িতে গিয়েছিলো বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে। পার্ক সার্কাসে শেরে বাংলার বাড়িটি আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল। শেরে বাংলা নিচে ড্রইং রুমে বসেছিলেন। কমল ও তার বন্ধুরা তাঁকে সালাম দিয়ে তাদের আবদারের কথা জানালো।

<

p>তিনি প্যাকেট থেকে সিলভার রঙ-এর কাগজটি বের করে একটি কাপ তৈরি করে বললেন, খেলায় কি এ ধরনের কাপ জিততে পারবে? কমল মাথা নেড়ে শেরে বাংলাকে জানান যে, তারা কাপ জেতার মনোবল রাখে। শেরে বাংলা খুশি হয়ে খেলার জন্য কমল ও তাঁর বন্ধুদের চাঁদা দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিক