আরেকবার সুযোগ দিন, বাংলাদেশের চেহারা বদলে দেবো : খালেদা জিয়া
বরিশালে গতকাল এযাবত্কালের সর্ববৃহত্ জনসমুদ্রে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তৃতায় জঙ্গি প্রসঙ্গে তিনি এ বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা আওয়ামী লীগের মুখোশ। এই আওয়ামী লীগ কুকুরের মাথায় টুপি দিয়ে দাড়ি লাগিয়ে কিভাবে ছেড়ে দিয়েছিল দেশবাসী তা দেখেছেন। আওয়ামী লীগের আমলে কোনো ধর্মের মানুষই নিরাপদ নয়। তারা হিন্দু ভাইবোনদের বাড়িঘর-মন্দির সম্পদ লুট করেছে। বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের ওপর এবার আঘাত হেনেছে। মুসলমানদের দাড়ি-টুপি দেখলেই জামায়াত-হরকাতুল জিহাদ নাম দিয়ে নির্যাতন করছে।
খালেদা জিয়া বরিশালের জনসমুদ্রে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার নেতৃত্বে বিএনপিকে আরেকবার সরকার পরিচালনার সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনাদের সহযোগিতায় ইনশাআল্লাহ দেশের চেহারা পাল্টে দেবো। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা এই চোরদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসুন, নইলে তাদের অপকর্মের দায়ভার নিতে হবে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে প্রধানমন্ত্রীর পরিবার অর্থাত্ তিনি, মেয়ে, বোন, ছেলে ও জামাই বাবু জড়িত। আওয়ামী লীগ আগে ব্রিফকেসে চুরি করতো, এখন বস্তায় বস্তায় চুরি করছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলেন, তিনি এতো মিথ্যা বলতে পারেন! আবার নিজেকে মুসলমানও দাবি করেন। এখন সারাদেশে একই শোর, আওয়ামী লীগ হলো বিশ্বচোর। এখন তারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলছে। তারা একদিন রক্ষা পাবে না।
বরিশালের বেলস পার্কের এই সমাবেশকে ঘিরে প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত অসামান্য সৌন্দর্যের এ নগরী সকাল থেকে মিছিল স্লোগান, ঢাকঢোলকের বাদ্য-বাজনায় মুখর হয়ে ওঠে। স্রোতের মতো মিছিলের ঢল নামতে থাকে নগরীর প্রাণকেন্দ্র বেলস পার্ক ময়দানমুখী হয়ে। দুপুরের আগেই ‘ঠাঁই নাই ঠাই নাই’ দৃশ্যপট রচিত হয়। বেগম খালেদা জিয়া বিকালে যখন মঞ্চে আরোহণ করেন তখন মাঠ ছাপিয়ে সন্নিহিত এলাকার পথঘাট লোকারণ্য হয়ে ওঠে। দেড় শতাধিক মাইকের আওয়াজ বেষ্টন করে রেখেছিল নগরীর এক বিরাট অংশ। মাঠের আশপাশের বড় বড় ভবনের শীর্ষেও ছিল মানুষ। নগরবাসী অতীতে কখনও এতো মানুষ দেখেননি সমাবেশে। মানুষ এসেছে আগৈলঝাড়া, নলছিটি, বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরগুনা, খেপুপাড়া, পাথরঘাটা, পিরোজপুর, মির্জাগঞ্জ, আমতলী, বেতাগী, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, বাউফল, কালাইয়া, কুয়াকাটা, ভোলা, দশমিনা, চরফ্যাশন, লালমোহন, বোরহানউদ্দিন, দৌলতখানসহ বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, থানা থেকে। এ নগরীতে গতকাল বাস, ট্রাক, লঞ্চ ও টেম্পোযোগে যারা প্রবেশ করেছেন প্রায় সবাই ছিলেন সমাবেশমুখী। ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল কাল দৃশ্যত পুরোমাত্রায় উত্সবের আনন্দে টইটুম্বুর ছিল। প্রায় দুই বছর পর বেগম জিয়ার আগমনকে কেন্দ্র করে বরিশালের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। রাতের বরিশাল তোরণে আর বহুবর্ণের আলোকমালায় উদ্ভাসিত ছিল। যেদিকে চোখ গেছে শুধু আলোক রোশনাই আর ডিজিটাল ব্যানার, স্বাগত তোরণ, বিশাল আকৃতির জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিকৃতি দেখা গেছে। আজ তারেক রহমানের ৪৮তম জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে তাকে নিয়ে বাড়তি আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। তার কর্মকাণ্ড, বক্তৃতার উদ্ধৃতি উত্কীর্ণ করে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ডিজিটাল ব্যানার স্থাপন করা হয়। সমাবেশ শুরুর আগে থেকেই সঙ্গীত বাদ্য-বাজনায় সবাইকে উজ্জীবিত করে রাখা হয়।
বেগম খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা এবং অভিবাদনে আপ্লুত করতে আয়োজনে কোনো কমতি ছিল না নাগরিকদের। রোববার মধ্যরাতে বেগম জিয়া যখন বরিশাল শহরে প্রবেশ করেন তখন মোড়ে মোড়ে উচ্চ নিনাদে বাজছিল দলীয় সংগীত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ...’। মানুষের ভিড় ঠেলে সার্কিট হাউস পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে তার গাড়িবহরের। এ সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। অধ্যাপক গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তি দাবি সম্বলিত বড় বড় ব্যানার প্ল্যাকার্ড হাতে বিপুল সংখ্যক জামায়াত কর্মী জমায়েত হন। বেগম খালেদা জিয়া মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমাগতদের উদ্দেশে যখন হাত উঁচিয়ে শুভেচ্ছ জানাচ্ছিলেন তখন জনসমুদ্রে স্লোগানে আনন্দে এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়। বেগম জিয়া তার বক্তৃতায় সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, পদে পদে ব্যর্থতা, নির্বচনী প্রতিশ্রুত ভঙ্গ, মানুষের দুর্দশার চিত্র এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। বেগম খালেদা জিয়া বলেন, আজকের এই জনসমুদ্রের পর দেশবাসী আর এ সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলে তারা ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু কোনো কাজ করেনি। চার বছরে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমি বরিশালসহ সারাদেশে কাজ করেছি, আবার ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন করা হবে। তাদের আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য হলো, আমরা উন্নয়ন করি আর তারা টাকা চুরি করে। চোরদের দিয়ে উন্নয়ন হয় না। তারা কুইক রেন্টাল করেছে চুরি করতে। ছয়বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। আবার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। আবার জনগণের পকেট কেটে কুইক রেন্টাল ওয়ালাদের পকেট ভরার ষড়যন্ত্র করছে। এ সরকার শুধু লুটপাট নিয়ে ব্যস্ত।
বেগম জিয়া বলেন, অপহরণকারী ছাত্রলীগারদের ধরা হয় না। পুলিশ হত্যাকারীদের ধরা হয় না। গুম-খুন নিত্যদিনের ঘটনা। সারাদেশে একই শোর, আওয়ামী লীগ হলো বিশ্বচোর। বিশ্বচোরদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। আওয়ামী লীগ নেত্রীর দুই হাতে মানুষের রক্ত আর জনগণের লুটের সম্পদ। তাদের হটিয়ে জনগণকে মুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, তারা দাপট দেখিয়ে চলছেন আপনারা একদিন রক্ষা পাবেন না। ক্ষমতায় থাকার জন্য সংবিধান সংশোধন করে তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দিয়েছে। আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না বলেই তারা এটা করেছে। এজন্য তারা কোর্টের দোহাই দেয়। কোর্ট এটাও বলে দিয়েছে, দুইবার তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হতে পারে। তাদের অধীনে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। এত ভয় কোথায়? কেন ভয়? দেখে যান, জনতার হাওয়া। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার দিন। আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না বলে তিনি হুশিয়ারি দেন।
বেগম জিয়া জনগণের উদ্দেশে বলেন, ওরা দশ টাকায় চাল খাওয়ানোর কথা বলেছিল, দশ টাকায় চাল খেতে পারছেন? বিনামূল্যে সার দেয়ার কথা বলেছিল। সার পাচ্ছেন? এ সময় সমস্বরে তীব্র নিনাদ তুলে জবাব আসে ‘না’।
‘আওয়ামী লীগকে জনগণের রক্তচোষা সরকার’ অভিহিত করে বেগম জিয়া বলেন, এই সরকার বলেছিল যুবকদের চাকরি দেবে। তোমাদের চাকরি দিয়েছে? উপস্থিত জনতা বলে ‘না’। তিনি বলেন, এরা বরং বিদেশে চাকরির বাজার নষ্ট করেছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না পেয়ে দিনে দিনে কমছে। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এ সরকারের ওপর বিদেশিদেরও সমর্থন নেই। তা আজ পরিষ্কার। বিএনপি জোট ক্ষমতায় গেলে আমাদের লক্ষ্য হবে দেশের উন্নয়ন এবং আমাদের ছেলেদের চাকরি দিয়ে দেশে প্রতিষ্ঠিত করা। তার জন্যই বলতে চাই, যুবকরা, তোমরা যদি তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতে চাও, তাহলে আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আন্দোলনে যোগ দিতে হবে। চুরি করার মজা পেলে সহসা বিদায় নিতে চায় না। চোরদের বিদায় করতে হলে আমাদের আন্দোলন করতে হবে।
বেগম জিয়া বলেন, মা-বোনদের কাজের ব্যবস্থা করা হবে। বস্তি উচ্ছেদ করা হবে না। হকারদের কাজের ব্যবস্থা করা হবে। গ্রামের প্রতিটি ছেলে-মেয়েকে স্কুলে যেতে হবে। আগামীতে ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের ফ্রি শিক্ষার ব্যবস্থা করে সরকারিসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের কাজের ব্যবস্থা করব।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আপনাদের পদ্মা সেতুর কথা বলেছিল। পদ্মা সেতু কী হচ্ছে? ‘না’। কেন হয়নি। সেতু হওয়ার আগেই টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে। এতে প্রধানমন্ত্রী আছে, ছেলে, বোন, মেয়ে ও জামাইবাবু সবাই জড়িত। বিশ্ব্যবাংক, আইএমএফ, আইডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগীরা বলেছে, দুর্নীতির কারণে আমরা টাকা দেব না। কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে আগেই তারা কমিশন নিয়েছে। এ নিয়ে এখন বিদেশিরা তদন্ত করছে এ সরকারের বিরুদ্ধে। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন বলেছিল, এতে দুর্নীতি পায়নি। এখন দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছে। ভবিষ্যতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে ধরা হবে, কেন তারা দুর্নীতি ধরতে পারল না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দুর্নীতির জন্য পদ্মা সেতু হলো না। সেতু করার মুরোদ নেই, আমাদের নামফলক উঠিয়ে কেবল নাম বসাতেই পারে তারা। আমি আপনাদের বলতে চাই, বিএনপি জোট ক্ষমতায় এলে দু’টি পদ্মা সেতু করব। একটি মাওয়া দিয়ে, অন্যটি আরিচা দিয়ে। দু’দিক দিয়ে মানুষ যেতে পারবে।
কেরানীগঞ্জে কয়েকদিন আগে শিশু পরাগ মণ্ডলকে ছাত্রলীগের ছেলেরা অপহরণ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়েছে। এতে মন্ত্রীর ভাগ্নেও জড়িত। এজন্য পরাগের মাকে ও বোনকে গুলি করা হয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে হিন্দু ভাইয়েরা নিরাপদ নয়। হিন্দুদের বাড়ি, জমি, মন্দির দখল করেছে। খ্রিস্টানদের জমি-বাড়ি দখল করেছে। রামু, উখিয়া, কক্সবাজারে তাদের বৌদ্ধমন্দিরে বোমা হামলা করেছে। লুট করেছে। অগ্নিসংযোগ করেছে। বাংলাদেশে আগে যা হয়নি, এই বৌদ্ধদের ওপর এবার তারা হামলা চালিয়েছে।
আর মুসলমানদের ওপর অব্যাহত আঘাত হানা হচ্ছে। দাড়ি-টুপি দেখলে হরকাতুল জিহাদ ও জামায়াত বলে ধরা হচ্ছে। নির্যাতন করা হচ্ছে। আমরা জঙ্গিবাদে বিশ্বাস করি না। সন্ত্রাসে বিশ্বাস করি না। বিভিন্ন লোক ধরে নিয়ে তারা বলে, জঙ্গি ধরেছি। ছাত্রলীগ দানব ও জঙ্গি। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ জঙ্গি হামলা করেছে। শিক্ষকদের ওপর হামলা করেছে। ৫৫ জন শিক্ষককে আহত করেছে। শিক্ষকদের ওপর হামলা করেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে। প্রশাসনে কাজ হচ্ছে না। স্থবির হয়ে গেছে। পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে না। তাদের বাধ্য করা হয়, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে অপকর্মে সহায়তা দেয়ার জন্য। পুলিশ ছাত্রলীগের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আছে। টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসী কাজে ছাত্রলীগকে সহায়তা দেয় পুলিশ। আমি জানতে চাই, ছাত্রলীগ প্রতিনিয়ত অস্ত্র নিয়ে ঘোরে, আজ পর্যন্ত অস্ত্রধারী কোন ছাত্রলীগকে ধরা হয়েছে। ছাত্রলীগ জমি দখল ও বাড়িঘর লুটপাট করছে।
বেগম খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ আজ চলতে পারে না। খেতে পারে না। আওয়ামী লীগ মানে দুর্ভিক্ষ। আওয়ামী লীগ মানেই নির্যাতন, চুরি, লুটপাট ও দুর্নীতি। তারা শেয়ারবাজার লুট করেছে। ৯৬ সালেও লুট করেছিল। এবারও ৩৫ লাখ মানুষকে পথে বসিয়েছে। আমাদের সময়ে শেয়ারবাজারে কোনো লুট হয়নি। আওয়ামী লীগ মানেই দুর্নীতি, লুটপাট। এজন্য তাদের নেতা শেখ সাহেব বলেছিলেন, সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। এখন চোরের খনি নিয়ে দেশ চালাচ্ছে। তাদের নেতা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন বলেই চোরদের নিয়ে কাজ করতে পারেননি।
তিনি বলেন, সোনালি ব্যাংক লুট হয়ে গেছে। হলমার্ক নামে অখ্যাত কোম্পানির নামে এ লুট করা হয়েছে। ডেসটিনির নামে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। এসব টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
আদালতে দলীয়করণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, বিচারবিভাগ দলীয়করণ করে শেষ করে দেয়া হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন দলীয়করণ হয়েছে। দেশ চলবে কীভাবে? এতগুলো ঘটনা ঘটেছে কোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিডিআর ম্যাসাকার হয়ে গেল। সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। জড়িতদের আড়াল করতে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি করা হচ্ছে। আমাদের সীমান্ত রক্ষীকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। আমরা ক্ষমতায় এলে সুষ্ঠু তদন্ত করে এ ঘটনার বিচার করা হবে।
জনগণের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, আগামীতে ভোট চোর, খুনি, লুটেরা, ভূমি দখলকারীদের আর সমর্থন দেবেন না।
বেগম খালেদা জিয়া প্রতিশ্রুতি দেন, আমরা ক্ষমতায় এলে বরিশালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও কুয়াকাটাকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্রে উন্নীত করা হবে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটাকে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সমস্যা নদীভাঙন। নদীভাঙন রোধ করতে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। দেশের অবস্থা অনেক খারাপ এবং দেশি-বিদেশি সবাই বলছে, আওয়ামী লীগের দ্বারা দেশের জন্য কিছুই করা সম্ভব নয়। আমি বলব, যদি আপনারা আপনাদের ছেলেমেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যত্ চান, লেখাপড়া চান, তাহলে এ সরকারকে সরাতে হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া বলেন, আমি চীন ও ভারত সফর করেছি। সেখানকার বড় ব্যবসায়ীরা এদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগ গ্যাস-বিদ্যুত্ দিতে পারে না, তাই তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। আমরা ক্ষমতায় এলে বিদেশিদের বিনিয়োগের সুযোগ করে দেব। গ্যাস-বিদ্যুত্ ও নিরাপত্তা দেব। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেব বিনিয়োগের।
তিনি বলেন, আমরা দেশ থেকে জঙ্গি দূর করব, কৃষক-শ্রমিকের উন্নতি করব। সব দল ও ধর্মের লোকদের যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেব। মডেল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে উপহার দেব।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবুর রহমান সারোয়ারের সভাপতিত্বে সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ, মির্জা অব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান ও জনসভার প্রধান সমন্বয়কারী আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীরবিক্রম), সেলিমা রহমান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর (বীরউত্তম), খন্দকার মাহবুব হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, সালাউদ্দিন আহেমদ, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল, সাধারণ সম্পাদক সরাফত আলী সপু ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবু, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরব, বিএনপির ধর্ম সম্পাদক মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার, সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন, সংসদ সদস্য শাম্মী আকতার, কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহীম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম রাজন, বরিশাল (দক্ষিণ) জেলা বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিব কামাল ও সাধারণ সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, জেলা (উত্তর) বিএনপির সভাপতি মেজবাউদ্দিন ফরহাদ এমপি ও সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দসুর রহমান, সাবেক এমপি আবুল হোসেন খান, ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব আহসান প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মজিবুর রহমান, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সভাপতি অলি আহমেদ বীরবিক্রম, খেলাফত মজলিশের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব আবদুল লতিফ নেজামী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু, এনডিপির সভাপতি খন্দকার গোলাম মুর্তজা, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইসলামিক পার্টির সভাপতি আবদুল মবিন, ন্যাপ সভাপতি জেবেল রহমান গাণি, ডিএল মহাসচিব সাইফুদ্দিন মনি, পিপলস পার্টির গরীবে নেওয়াজসহ ১৮ দলীয় জোটের শরিক নেতারাও বক্তৃতা করেন। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে আরও বক্তৃতা করেন বিএনপি নেতা এবায়দুল হক চান, মাহবুবুল হক নান্নু, অধ্যাপক আলমগীর হোসেন, গাজী নুরুজ্জামান বাবুল, মাহবুব ফারুক মোল্লা, আনম সাইফুল আহসান আজিম, মীর জাহিদুল কবির জাহিদ, রফিকুল ইসলাম শাহিন, শাহেদ আকন সম্রাট, খন্দকার আবুল হাসান লিমন, হাসান মামুন প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান রাজন, মহানগর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জম হোসাইন হেলাল, মহানগর বিএনপির সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহিন, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহবুবুল হক নান্নু, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন ও উত্তর জেলা বিএনপির সম্পাদক অধ্যাপক আকন কুদ্দুসুর রহমান।
জোটের শীর্ষ নেতারা যা বললেন : জনসভায় বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের দুর্নীতি-লুটপাট, আন্দোলন এবং জোটের ভবিষ্যত্ দেশ গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরে বক্তৃতা করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আজকের এ জনসভায় সাঈদীসহ শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা আজ মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি। প্রধানমন্ত্রী শরিয়া আইনে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলেছেন, অথচ তিনি নিজেই সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা তুলে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী জনগণের সঙ্গে ঠাট্টা করেছেন। ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধের রায় দেয়া হবে—মন্ত্রীদের এমন বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, এ রায় বিচারকরা দেবেন না, দেবে আওয়ামী লীগ। পুলিশকে জামায়াত-শিবির নিধনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, খুনিরাই এ ধরনের নির্দেশ দিতে পারে, যারা মানুষ হত্যায় বিশ্বাস করে।
এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন জনগণ আশা করে না। আর সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত পরাজয় জেনে তারা একতরফা নির্বাচনের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এদেশের মানুষ তা হতে দেবে না।
বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবি ছিল পদ্মা সেতু। বর্তমান সরকারের দুর্নীতির কারণে মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। ১৮ দলীয় জোট নেত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আপনার সঙ্গে আছে। পদ্মা সেতু ও নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পসহ উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যতে এসব মানুষকে পাশে পাবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট আর ব্যর্থতায় টাঙ্গাইলের মানুষ রোববার নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে। আগামী দিনে বৃহত্তর বরিশালেও নৌকা ডুবে যাবে।
স্থায়ী কমিটির আসম হান্নান শাহ বলেন, ব্যর্থ দুর্নীতিবাজ আর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতন ছাড়া দেশবাসীর মুক্তি নেই। তাই সরকার পতনে দেশনেত্রী যে কর্মসূচি দেবেন জীবন দিয়ে হলেও তা পালন করা হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ঢাকার সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতিতে জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। আর তা বুঝতে পেরে অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই বলছেন, পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছি না।
বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এবং বরিশালের ১৮ দলীয় কর্মসূচির প্রধান সমন্বয়কারী আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, বরিশালের এ বিশাল সমাবেশ প্রমাণ করে দেশের মানুষ দেশ পরিচালনায় এ সরকারকে আর চায় না। এ সমাবেশ প্রমাণ করে দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহাল চায়।
জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেন, চোর দেখেছি, কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো এত বড় চোর দেখিনি যে আস্ত পদ্মা সেতু গিলে খেতে পারে। এ বিশ্বচোরকে বিদায় করতে নৌকাকে ৩০ ফুট পানির নিচে ডোবাতে হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা বলেন, দুর্নীতিবাজ এ সরকারকে উত্খাত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে কর্মসূচি দেবেন, ঐক্যবদ্ধভাবে তা পালন করতে হবে সবাইকে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বলেন, আওয়ামী সরকারের হাতে গণতন্ত্র বিপন্ন। দেশের কোথাও জানমালের নিরাপত্তা নেই। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে এ সরকারের পতন ঘটাতে হবে।
জনসভা শেষে বেগম খালেদা জিয়া বরিশাল সার্কিট হাউসে বিশ্রাম শেষে পৌনে ৭টায় ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। ফিরতিপথেও বিএনপি নেতাকর্মীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে দলীয় নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, আওয়ামী লীগের ঘরে ঘরে জঙ্গির অবস্থান। শায়খ আবদুর রহমান কে? মির্জা আজমের দুলাভাই। জঙ্গি সৃষ্টি করেছে আওয়ামী লীগই। আমরা শায়খ আবদুর রহমান, বাংলাভাইসহ বড় বড় জঙ্গিদের ধরে ফাঁসি দিয়েছি।
 
@amardeshonline.com